Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২৮ মার্চ, ২০১৮ ১০:১৭ অনলাইন ভার্সন
বুড়িগঙ্গায় চাঁদাবাজির বিস্তার
মাহবুব মমতাজী
বুড়িগঙ্গায় চাঁদাবাজির বিস্তার
রাজধানীর সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার নৌকা মাঝি, ঘাটশ্রমিক, ফলের দোকান থেকে চাঁদাবাজি থামছে না। ছবি : জয়ীতা রায়

থেমে নেই সদরঘাটের বিভিন্ন পর্যায়ের চাঁদাবাজি। সমানতালে চলা কুলিদের দৌরাত্ম্যেও অতিষ্ঠ সাধারণ যাত্রীরা। প্রতিদিনই এই ঘাটকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকার লেনদেন আর ভাগবাটোয়ারা হয় চাঁদাবাজদের মাঝে। যাত্রীদের অভিযোগ, সদরঘাটে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায়ই জোর করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে ঘাটের নীল শার্ট পরা কুলিরা। ঘাটের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভারী মালামালের জন্য কিছু ফি নির্ধারিত আছে। এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে যাত্রীরা তাদের খুশিমতো কুলিদের ভাড়া দিবেন। বরিশাল উজিরপুরের কয়েকজন যাত্রীর অভিযোগ, ঘাটের কুলিরাই চাঁদাবাজ বনে গেছে। যাত্রীরা কুলিদের কাছে কোনো মালামাল দিতে না চাইলেও কুলিরা জোর করেই তা বহন করে। বহন বাবদ মজুরি হিসেবে আদায় করা হয় অনেকটা জিম্মি করে। দাবি করা টাকা দিতে না চাইলে মালামাল পানিতে ফেলে দেওয়ারও হুমকি দেন তারা। তার আগে জেটিতে প্রবেশের মুখে কুলিরা সদলবলে ঘিরে ধরে যাত্রীদের।

ঘাটের হকারদের দাবি, যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় হওয়া অতিরিক্ত চাঁদার টাকা পুলিশ, ঘাটশ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে শুরু করে ঘাট কর্তৃপক্ষের মধ্যে বণ্টন হয়। তাদের চাঁদাবাজি চলে নৌকার মাঝি, ঘাটের ফলের দোকান এবং হকার থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি পর্যায়ে। এসব নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক পৃথক লোক রয়েছে। জানা গেছে, টার্মিনালে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানো ও হকারির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে চাঁদাবাজরা সেখানে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেয়। প্রতিদিন প্রতি হকারের কাছ থেকে ২০০ টাকার বেশি আদায় করা হয়। এ ছাড়া নদীর ওপর ভাসমান দোকানগুলো থেকে আদায় করা হয় ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত। রুটির এক হকার তোফায়েল (ছদ্মনাম) জানান, টার্মিনালের ভাড়া, পুলিশ, কুলিদের চাঁদাসহ ফলের দোকান থেকে আদায় করা হয় ২০০ টাকা। পান, বিড়ির দোকান থেকে আদায় করা হয় ১০০ টাকা। ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৩০০-৫০০ টাকা আদায় করা হয়। এই চাঁদাবাজদের কবল থেকে মাঝিদেরও রেহাই নেই। সদরঘাট থেকে বিভিন্ন ঘাটে খেয়া পারাপারকারী মাঝিদের কাছ থেকে পার্কিং এবং খাজনার নামে খেয়াপ্রতি ৭০ টাকা করে আদায় করা হয়। চাঁদাবাজদের হাত থেকে রেহাই মিলে না অটোরিকশা ও রিকশা চালকদেরও। ভুক্তভোগীরা জানান, টার্মিনালের উত্তরপার্শ্বে অর্থাৎ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কমিউনিটি সেন্টারের সামনের দিকের ফাঁকা স্থানে প্রাইভেট গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অটোরিকশা পার্কিং বাবদ নির্ধারিত ফির বাইরে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় কিছু লোক সেখানে গাড়িপ্রতি ৪০-১০০ টাকা পর্যন্ত পার্কিং চার্জ নেন।    

সদরঘাট নৌকা মাঝি শ্রমিক লীগের সভাপতি ও ঘাট শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাভেদ হোসেন মিঠু বলেন, ঘাটে যারা সার্বক্ষণিক থাকে এবং আশপাশে যাদের পোস্টার ঝুলে তারাই চাঁদাবাজি করেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে চলে চাঁদাবাজি। সদরঘাট দিয়ে খেয়া পারাপারে প্রায় প্রতিদিনই ২৫-৩০ হাজার লোক হয়। অথচ হিসাব দেখানো হয় ১৫-২০ হাজার লোকের। বাকি টাকা লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া যায় সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, আগে ছিল ইজারাদাররা। এখন সিবিএ নেতাদের লোকজনের স্বেচ্ছাচারিতা আর অশোভন আচরণে অনেকটা জিম্মি সাধারণ যাত্রীরা। ইজারা বাতিলের পর সদরঘাট টার্মিনাল ও খেয়াঘাট সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে বিআইডব্লিউটিএ। আর ঘাটে আসা-যাওয়া যাত্রীদের কাছ থেকে টোল আদায় করেন সংস্থাটির কর্মচারীরা। জানতে চাইলে সিবিএ নেতা আবুল হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, আমরা টার্মিনালে প্রবেশ ফি ৫ টাকার টিকিট কাটার কাজটি করি। এর মধ্যে ২ টাকা জমা হয় যাত্রী কল্যাণ বাবদ, আর বাকিটা সরকারি কোষাগারে। এ ছাড়া এখন আর কেউ চাঁদাবাজি করে না। যারা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন মূলত তারাই করতেন।

সদরঘাটের হকার, নৌকা মাঝি ও যাত্রীসহ একাধিক সূত্র জানায়, সদরঘাটের আশপাশের তিনটি নৌকাঘাট থেকে কেরানীগঞ্জের আলম মার্কেট, কালীগঞ্জ, আগানগর ঘাটে ২৫০ যাত্রীবহনকারী নৌকা মানুষ পারাপার করে। এসব নৌকায় নদী পারাপারে যাত্রীপ্রতি বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত টোল ৫০ পয়সা। দলগতভাবে ৮-১০ জন যাত্রী নিয়ে যেসব নৌকা যাত্রী পারাপার করে তারা প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ২-৫ টাকা করে ভাড়া নেয়। আর এককভাবে যে যাত্রী নৌকায় নদীর এপার থেকে ওপার যায় তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২০-২৫ টাকা করে। ঘাট ব্যবহারে জনপ্রতি ফি দিতে হয় দুই টাকা।

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow