Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১ জুন, ২০১৮ ১৫:২৮ অনলাইন ভার্সন
উৎসবের খাবারে ভেজালের বিষ
জয়শ্রী ভাদুড়ী
উৎসবের খাবারে ভেজালের বিষ
মুড়ি সাদা করতে কেমিক্যাল মেশানো পানিতে ভেজানো হচ্ছে ধান —বাংলাদেশ প্রতিদিন

রমজানকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে ইফতার বাজার। ইফতারে ব্যবহৃত শরবত থেকে শুরু করে মুড়ি, বিভিন্ন রকমের চপ, সেমাই সবকিছুতেই মেশানো হচ্ছে ভেজাল। সারা দিন রোজা  থেকে এসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন রাজধানীবাসী। এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চললেও কমছে না এদের দৌরাত্ম্য।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ইফতারে আলুর চপ, পিয়াজুসহ বিভিন্ন রকমের তেলে ভাজা খাবারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। এজন্য সব দোকানে রোজার প্রথম দিন থেকেই দোকানিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন এসব খাবার তৈরিতে। কড়াইভর্তি তেলে এসব ভাজাপোড়া শেষে ঢেলে রাখা হয় ওই তেল। পরের দিনও একই তেলে শুরু হয় এসব খাবার তৈরি। বার বার একই তেল ব্যবহার করায় সয়াবিন তেল কালো নোংরা হয়ে যায়। এরপরও এসব তেল ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না দোকানিরা। নিজেদের ফায়দা খুঁজতে ক্রেতাদের অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করছেন অধিকাংশ দোকান মালিক।

এসব দোকানের পাশেই ছোট ছোট দোকান ঘরে বিভিন্ন ফলের জুসের নামে রঙিন শরবত বিক্রি করা হচ্ছে। এসব শরবত কোম্পানির না আছে কোনো পরিচিত, না আছে বিএসটিআইর সিল। শুধু পথের পাশের দোকান নয়, এগুলো বিক্রি চলে নামিদামি কনফেকশনারিতে। পুরান ঢাকার এক ড্রিংস তৈরির কারখানায় দেখা যায়, নোংরা পরিবেশে কেমিক্যালের মধ্যে রং ঢেলে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মিশ্রণ। এরপর বদ্ধঘরে ফ্যান দিয়ে শুকানো হচ্ছে এসব মিশ্রণ। এরপর প্যাকেটে ভরে সরবরাহ করা হচ্ছে বাজারে। না আছে কোনো পরিচ্ছন্নতার বালাই, না আছে কোনো বিএসটিআইর মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। জুসে ফলের রস ৬০ ভাগ থাকার নিয়ম থাকলেও এগুলোতে নেই তার কিছুই। এসব জুসে যেসব রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় সেগুলোর কতটুকু ব্যবহার কী ধরনের ক্ষতি করবে তাও জানে না এখানকার শ্রমিকরা। হাতের মাপে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন রকমের কেমিক্যাল। ইফতারের অন্যতম অনুসঙ্গ মুড়িতেও মেশানো হচ্ছে ইউরিয়া সার। ফলমূলও রেহাই পাচ্ছে না এসব অবৈধ পাইকারদের হাত থেকে। পাউডার দিয়ে, তাপ দিয়ে পাকানো হচ্ছে কলা, আমসহ অন্যান্য ফল। কাঁচা আম দ্রুত পাকানোর কারণে পুষ্টিগুণ থেকে যাচ্ছে অসম্পূর্ণ। এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগে প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় চলছে অভিযান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫ এর নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম অজিয়র রহমান বলেন, আমরা রমজানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিন দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। এর মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি এবং বাসি, পচা খাবার সরবরাহের প্রবণতা বেশি দেখেছি। এ ছাড়া অনেকেই আগের দিন ভাজা তেল জারে জমিয়ে রাখেন। ভোক্তা অধিকার আইনে তাদের জরিমানা করা হয়েছে। আর যারা ফুটপাথ দখল করে অস্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করছে তাদের দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক বলেন, যারা এসব ভেজাল পণ্য উৎপাদন এবং বিক্রি করে তাদের জন্য ভোক্তা অধিকার আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। খাবারে ভেজাল মেশানোর কারণে ১ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ থেকে ২০ লাখ টাকার অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। বড় বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এসব ভেজাল খাদ্যপণ্য। কেবল মুনাফার লোভে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশাচ্ছেন। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে এসব ভেজাল খাবার বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাননিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআইর নকল সিলও ব্যবহার হচ্ছে অনেক খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের গায়ে। ভেজাল মেশানো এসব খাবার শত শত মানুষের স্বাস্থ্যহানি, এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে মানুষের বদ হজম, ডায়রিয়া, আমাশয়, লিভার সমস্যা, কিডনিতে বিভিন্ন রকমের সমস্যা তৈরি হয়। এসব খাবার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের জন্য এসব খাবার মারাত্মক ঝুঁকির কারণ।

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow