Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৭ মে, ২০১৮ ২৩:২৩
অপরাধ দমনে রমজানের ভূমিকা
যুবায়ের আহমাদ
অপরাধ দমনে রমজানের ভূমিকা

বছর ঘুরে আবারও আমাদের কাছে এলো পবিত্র রমজান। রমজানের মূল ইবাদত হলো সিয়াম তথা রোজা। আর রোজার লক্ষ্য হলো মানুষকে মুত্তাকি (আল্লাহভীরু) বানানো। ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ সূরা বাকারা : ১৮৩। কোরআনুল কারিমে তাকওয়া শব্দটি এসেছে ১৫ বার। তা ছাড়া অনেকবার আল্লাহতায়ালা ‘ইত্তাকু’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাকওয়া কী? তাকওয়া অর্থ আল্লাহভীতি। তাফসিরে এসেছে, ‘আল্লাহর আদেশসমূহ পালন ও নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকাই তাকওয়া।’ তাফসিরে জালালাইন-১/৯। ব্যাপক অর্থে বলতে গেলে তাকওয়া তো মানুষের মনে আল্লাহর ভয়ে হালাল-হারামের বিধানের প্রতি ওই শ্রদ্ধা ও ভীতি যা মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রত্যেক মানুষের গোপনে অপরাধ করার প্রবণতা থাকে। যেখানে পুলিশ কিংবা কোনো মানুষ পাহারা দিতে পারে না। সেই গোপন অপরাধের জায়গায় আল্লাহর ভয়ের অদৃশ্য পাহারাটাই হলো তাকওয়া। রোজার মাধ্যমে এই পাহারা মজবুত হবে। আইনের প্রতি মানুষ শ্রদ্ধাশীল হবে। অন্তরে তাকওয়া (আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ) নামক অদৃশ্য সিসি ক্যামেরার পাহারা বসাতে পারলেই সমাজ থেকে অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে।

ইতিহাস সাক্ষী, তাকওয়ার মাধ্যমে অপরাধ দমনের এ পদ্ধতি শতভাগ সফল হয়েছিল। কারণ, এতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন আইন প্রণয়নের পরই মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। সূরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াত নাজিল করে যখন মদ নিষিদ্ধ করা হলো তখন রসুলে আকরাম (সা.) হাফেজ সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন, গলিতে গলিতে আয়াতটি পাঠ করার জন্য। আইনপ্রণেতার ভয় ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ফলে তখন কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক ছাড়াই সাহাবায়ে কিরাম (রা.) মদ ত্যাগ করলেন। মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষণা শুনে যার হাতে মদের গ্লাস ছিল তিনি তা ছুড়ে ফেললেন; যার মুখে মদ ছিল তিনি তা ফেলে দিয়ে কুলি করলেন; যিনি ওই সময় মদ পানরত ছিলেন তিনি গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে পেট থেকে মদ বের করার চেষ্টা করলেন। যার বাড়িতে মদের কলসি ছিল তিনি লাথি মেরে তা ভেঙে ফেললেন। মদিনার রাস্তায় মদ প্রবাহিত হয়ে গেল। ইবনে কাসির-৭/৯০৯।

পুলিশ-জনগণ সবাইকে আল্লাহর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে তাই রমজান। একটি দেশের ক্ষুদ্রতম ইউনিট (একক) হচ্ছে নাগরিক, প্রত্যেক নাগরিক যতক্ষণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হবে ততক্ষণ সে আইন সমাজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আইনকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরির জন্যই তাই পুলিশ-নাগরিক সবাইকে অপরাধপ্রবণতা থেকে বাঁচানোর জন্যই রোজার ব্যবস্থা। সিয়াম তথা রোজার সংজ্ঞার দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। রোজার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘পানাহার, সহবাস ও সব ধরনের গুনাহের কাজ ছেড়ে দেওয়াই রোজা।’ শুধু পানাহার ত্যাগ করে গুনাহের কাজ না ছাড়লে তা কিছুতেই রোজা হবে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পানাহার বর্জনের নাম সিয়াম নয়; সিয়াম হলো অনর্থক ও অশ্লীল কথা এবং কাজ বর্জন করা। বায়হাকি-৪/২৭০। অর্থাৎ রোজার মাধ্যমে পানাহারের মতো একটি বৈধ বা জায়েজ বিষয়কেও যখন অল্প সময়ের জন্য আল্লাহ নিষিদ্ধ করে দিলেন, সেই নিষিদ্ধ বিষয়টিকে যেমন সে ‘না’ বলে প্রচণ্ড ক্ষুধার সময়েও পানাহার না করে আল্লাহর আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায় তেমন সব অপরাধকে ‘না’ বলে সেগুলোও ছেড়ে দেওয়ার বাস্তব প্রশিক্ষণ নিতে হবে রোজা থেকে। তবেই সে রোজাদারের পূর্ণ পুরস্কারের যোগ্য হবে। মানে হলো  কোরআনে নিষিদ্ধ জিনিসগুলো ছেড়ে দেওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। নিজেকে বিরত রাখতে হবে সব ধরনের মিথ্যা ও পাপাচার থেকে। কোরআনের শান্তির সমাজ গড়ার মিশন বাস্তবায়নের মতো যোগ্য ও তাকওয়া-সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ, মিথ্যা কথা, অন্যায় ও মূর্খতাসুলভ কাজ ত্যাগ করতে না পারবে তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। বুখারি।

লেখক : খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ

বোর্ডবাজার (আবদুল গনি রোড) গাজীপুর।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow