Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ২০ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৯ জুন, ২০১৮ ২৩:১৬
শেষে বিএনপিও ভারতপন্থি?
বিভুরঞ্জন সরকার
শেষে বিএনপিও ভারতপন্থি?

কোনো রাখঢাক না করে বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যেই এটা বলছেন যে তারা আগামী নির্বাচনে ভারতের সহযোগিতা চান। প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশ ভারতের সহযোগিতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ১০ জুন বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারতের সহযোগিতা তারা চান। বিএনপি মনে করছে, ভারত চাইলে বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারে। বাংলাদেশে ভারতের যথেষ্ট প্রভাব আছে। এই প্রভাব খাটিয়েই তারা এখানে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে।

বিএনপি বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। ভারত বিরোধিতা যে বিএনপির রাজনীতির একটি বড় উপাদান তা নিয়ে বিতর্ক করা অর্থহীন। বহু ঘটনা থেকে এটা প্রমাণ করা যাবে যে, ভারত সম্পর্কে বিএনপির মনোভাব কী! বিবিসি এ নিয়ে মির্জা ফখরুলকে প্রশ্ন করেছিল। বিবিসির প্রশ্ন ছিল : বাংলাদেশে বিএনপির ভাবমূর্তি একটি ভারতবিরোধী দল হিসেবে। এখন মানুষ যদি দেখে বিএনপিও ভারতের দ্বারস্থ হচ্ছে, সেটা কি বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করবে না?

মির্জা ফখরুলের জবাব : আপনারা এটাকে এমনভাবে দেখছেন কেন? আপনারা যেমনভাবে বলছেন তাতে এটা দাঁড়ায় যে, এটা একটা প্রতিষ্ঠিত ইমেজ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে নয়। বিএনপি যেটা বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। আর বিএনপিকে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখতে হবে। সেই স্বার্থ দেখতে গিয়ে কেউ যদি বলে, আমরা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছি, সেটা কিন্তু সঠিক একটা অ্যানালিসিস নয়। আমি মনে করি, পারস্পরিক মর্যাদাবোধ, পারস্পরিক স্বার্থ—এটা খুব জরুরি। ভারতের তো এটা দায়িত্ব, যাতে বাংলাদেশে তাদের বিরোধী মনোভাব বা ধারণা তৈরি না হয়। এমনটা হলে তাদের জন্যও ক্ষতিকর, আমাদের জন্যও ক্ষতিকর।

ভারত কেন বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে, বিশেষ করে বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের এত ভালো সম্পর্ক এবং বিএনপির ব্যাপারে ভারতে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে? বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন : এ সন্দেহ অনেকটাই অমূলক। কারণ বাংলাদেশে বিএনপি সরকার কখনই ভারতের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করেছে বলে জানা নেই। আর দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটা সরকার ভারতের জন্যই খুব প্রয়োজন। আর ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরী সম্পর্ক যেগুলো প্রচার করা হয়, তা ঠিক নয়।

বিএনপি আমলে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানের মতো ঘটনা ঘটেছে, যেটা ভারতের কাছে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়—বিবিসির এমন মন্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন : এ ঘটনাগুলো কতটা সত্যি, কতটা তৈরি করা, তা কিন্তু এখনো পরিপূর্ণভাবে জানি না।

বিবিসি জানতে চেয়েছিল : ভারতের মধ্যে বিএনপির ব্যাপারে যে সন্দেহ, সেটা দূর করতে বিএনপির কোনো কৌশল কি আছে?

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের উত্তর : অবশ্যই। আমরা তো সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক হবে, সে সম্পর্কে আমরা একটা পেপারও দিয়েছি। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলেছি, উই উইল হ্যাভ জিরো টলারেন্স অ্যাবাউট অ্যানি ইনসারজেন্সি ইনসাইড বাংলাদেশ। তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। স্পষ্ট করে বলেছি, তাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। স্পেস থাকবে না। এটা যদি সরকারে যাই, অবশ্যই নিশ্চিত করব।

বিএনপি মহাসচিবের সাক্ষাৎকারটি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে যে কারও কাছেই এটা স্পষ্ট হবে যে, বিএনপি তার ভারতনীতিতে পরিবর্তন আনতে চাইছে। ভারতবৈরিতা বিএনপির জন্য লাভের হচ্ছে না—এটা সম্ভবত বিএনপি নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছেন। কিছু কিছু বিষয়ে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য স্ববিরোধী, আবার কিছু বক্তব্য অসত্য। অবশ্য এতদিনের অবস্থান ও অভ্যাস বদলাতে গিয়ে এমনটা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বিএনপি ভারতকে একটি ‘পেপার’ দিয়েছে। লিখিত কিছু অঙ্গীকার করেছে, যেটা বিএনপি সরকারে গেলে ‘অবশ্যই নিশ্চিত’ করবে। এই পেপারের বিষয়টি বিএনপি আগে কখনো বলেছে বলে মনে পড়ে না। আমাদের কোনো গণমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত খবর দেখা যায়নি। ব্যাপারটা কী?  কবে এই পেপার বা অঙ্গীকারনামা দেওয়া হলো? এটা এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল কেন? এটা কি ‘মুচলেকা’ জাতীয় কিছু?

বিবিসির কাছে এই তথ্য প্রকাশ করার পরও আমাদের দেশের গণমাধ্যম এটা নিয়ে আগ্রহী হলো না কেন? আওয়ামী লীগ যদি এমন কোনো লিখিত পেপার ভারতকে দিত তাহলে সেটা নিয়ে  কি পরিমাণ শোরগোল হতো তা সহজেই অনুমান করা যায়।  আওয়ামী লীগের ভারতপ্রীতির সমালোচনায় যারা সদা উচ্চকণ্ঠ, বিএনপির ব্যাপারে তাদের বর্তমান নীরবতার কারণ কী?

বিএনপি মহাসচিব বাংলাদেশের স্বার্থ দেখার কথা বলেছেন। খুব ভালো কথা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল তো বাংলাদেশের স্বার্থই দেখবে। প্রশ্ন হলো, বিএনপি তো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, সরকার চালিয়েছে। তখন বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ে কতটুকু জোরালো ভূমিকা তারা পালন করেছিল? ভারতের সঙ্গে কোনো অমীমাংসিত সমস্যা বিএনপি সমাধান করতে পেরেছিল?  বাইরে তীব্র ভারত বিরোধিতা, আর তলে তলে দিল্লির শাসকগোষ্ঠীকে তোয়াজ করার নীতিই কি বিএনপি অনুসরণ করেনি? ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনার সত্যতা নিয়ে একদিকে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি মহাসচিব, অন্যদিকে লিখিত পেপারে বলেছেন, ‘তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হবে না, অস্তিত্ব থাকবে না’ ইত্যাদি। অতীতে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল এবং অস্তিত্ব ছিল বলেই তো অমন অঙ্গীকারের প্রয়োজন হয়েছে। নয় কি? বিএনপি সরকারে থাকতে ভারতের স্বার্থবিরোধী কিছু করেনি—বলেছেন মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে বিএনপি!  এও কি সম্ভব?

গরু হারিয়ে গ্রামের কৃষক যেমন স্ত্রীকে মা বলে সম্বোধন করে বলেছিল, ‘গরু হারালে মাথা ঠিক থাকে নারে মা’, ঠিক তেমনি ক্ষমতা হারিয়েও বিএনপির মাথা ঠিক নেই। ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য বিএনপি এখন মরিয়া। তাই তাদের এতদিনের ভারতভীতি এখন ভারতপ্রীতিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের কাছে দেন-দরবার করছে। তাদের ক্ষমতায় না বসানো ভারতের জন্যই ক্ষতিকর—এমন কথাও বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এমন সরকার ভারতের জন্যই প্রয়োজন—এসব কথার অর্থ কী? বিএনপি কি তাহলে ভারতের স্বার্থের পাহারাদার হতে চাইছে?

বিএনপির এসব কথা কি দিল্লির মন গলাতে পারছে? দিল্লি কি বিএনপিকে কোনো ‘এনওসি’ দিয়েছে? আমরা জানি না। তবে আমরা একটু ভারত প্রশ্নে বিএনপির অতীতটা স্মরণ করতে পারি। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে দাসত্বের চুক্তি বলে মনে করত বিএনপি। যদিও বিএনপির জন্মের আগে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের আগে বিএনপির মূল প্রচারণা ছিল : আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশ ভারত হয়ে যাবে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ফারাক্কার পানি বণ্টন চুক্তি করলে বিএনপি তাকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করছিল। পার্বত্য শান্তি চুক্তিরও বিরোধিতা করেছে বিএনপি। খালেদা জিয়া নিজেই বলেছিলেন, ওই চুক্তির ফলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ক্ষমতায় গেলে এই দুই চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ২০০৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র আটক হয়েছিল, যা ভারতের আসাম রাজ্যের উলফা বিদ্রোহীদের জন্য আনা হয়েছিল। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেননি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপির তিন নেতা সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়ে এগুলোকে অতীতের বিষয় বলে উল্লেখ করে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বৈরী আচরণ ‘ভুল’ ও ‘বোকামিপূর্ণ’ ছিল। বিএনপি এখন নতুন দৃষ্টভঙ্গি নিয়ে নতুনভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন করতে চায়। এটা নাকি বিএনপির ভবিষ্যৎ-কাণ্ডারী তারেক রহমানের চাওয়া!

অতীতের বোকা বিএনপি এখন বুদ্ধিমান হওয়ার দাবি করছে। কিন্তু পোলাও না খেয়ে কি তার স্বাদ সম্পর্কে কোনো সার্টিফিকেট কেউ দেবেন? ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বলেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক তা হুট করে গড়ে ওঠেনি। এই সম্পর্কের একটি ধারাবাহিকতা আছে। ইতিহাস আছে। পারস্পরিক নির্ভরতা আছে। দৃষ্টিভঙ্গির সাযুজ্য আছে। আওয়ামী লীগের আমলে ভারত ও বাংলাদেশ সবদিক দিয়ে এগিয়ে চলেছে। বিএনপির সময়ে, দুঃখের কথা, এই নির্ভরতা বা ধারাবাহিকতা ছিল না।

নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারতের সহযোগিতার প্রসঙ্গে এই সাবেক কূটনীতিকের বক্তব্য : বাংলাদেশের ভোট করেন সে দেশের মানুষ। অন্য কোনো দেশের ভোটে ভারতের কোনো ভূমিকা কোনো দিন ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।

ভারত বলছে কারও ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই। বাংলাদেশের জনগণই সেটা করে। অথচ বিএনপি মনে করে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসায় ভারত। এখন তর্কের খাতিরে বিএনপির কথা সত্য ধরে নিলে প্রশ্ন আসে, আওয়ামী লীগ যদি ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ক্ষমতায় যায় এবং টিকে থাকে, সেটা যদি খারাপ এবং অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে বিএনপি যদি একই পথ অনুসরণ করে তা কেন সমর্থনযোগ্য এবং নন্দিত কাজ হবে? বিএনপির জুতা যেমন আওয়ামী লীগের পায়ে বেমানান, তেমনি আওয়ামী লীগের জুতাও বিএনপির পায়ে মানানসই হওয়ার কথা নয়। না-কি এ ক্ষেত্রেও আমাদের সেই আপ্তবাক্য আওড়ে শান্তি পেতে হবে যে—‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই!’

 

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই পাতার আরো খবর
up-arrow