Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৭ মে, ২০১৮ ২৩:০২
ইফতারিতে ভেজাল আতঙ্ক
♦ মুড়িতে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড
♦ পিয়াজু-বেগুনিতে টেক্সটাইল রং
♦ দুধ মাছ ফলে ক্ষতিকর ফরমালিন কার্বাইড
সাঈদুর রহমান রিমন
ইফতারিতে ভেজাল আতঙ্ক
যাত্রাবাড়ীর ফলের আড়তে গতকাল বিপুল পরিমাণ রাসায়নিকযুক্ত আম ধ্বংস করা হয় —রোহেত রাজীব

দিনভর রোজা পালন শেষে ইফতারিতে ‘ভেজালমুক্ত’ হিসেবে কী খাবেন তা নিয়ে রোজাদারের মনে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইফতারির অপরিহার্য উপকরণের মধ্যে রয়েছে ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি, মুড়ি ও জিলাপি। এর প্রতিটিই ভেজালের শিকার। মুড়ি ছাড়া ইফতার অকল্পনীয়। সেই মুড়িকে সাদা করতে ব্যবহূত হচ্ছে ট্যানারিতে ব্যবহার্য বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড। বড় বড় দানার মুড়ি তৈরি করা হয় রাসায়নিক সার দিয়ে। জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখতে ব্যবহূত হচ্ছে পোড়া মবিল। ভাজাপোড়ায় ব্যবহূত তেল কড়াই থেকে আদৌ কোনো দিন সরানো হয় কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বেগুনি, পিয়াজু, চাপ ইত্যাদি তেলেভাজা ইফতারিসামগ্রী আকর্ষণীয় করতে ব্যবহূত হচ্ছে কেমিক্যাল রং। ইফতারির আরেক অনুষঙ্গ খেজুর। মেয়াদোত্তীর্ণ, পচা দুর্গন্ধযুক্ত খেজুরে বাজার সয়লাব হয়ে আছে। দেশীয় ফল-ফলারির অবস্থা আরও শোচনীয়। ফরমালিন আর কার্বাইড মেশানো ফল-ফলারি নিয়েই সাজানো হচ্ছে ইফতার। প্রতি বছর ইফতার পণ্যে এই মহড়ার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও ভেজালচক্রের কাছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সব চেষ্টা যেন ব্যর্থতায় পরিণত হয়। খাদ্যপণ্যে ভেজালের বিষ প্রতিরোধে একের পর এক আইন করা হচ্ছে। পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবু মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফল। ভেজাল পণ্য গছানোর ‘প্রতিযোগিতা’ দেশময়। এই দৌরাত্ম্য পবিত্র রমজান ঘিরে বেড়ে যায়। সিটি করপোরেশনের বাজার পরিদর্শকরা বলেন, দোকানে বা ফুটপাথে যে ইফতারি বিক্রি হয় তার প্রায় ৯০ ভাগই ভেজাল। ভেজালের পাশাপাশি রয়েছে বাসি বা পুরনো খাবার বিক্রির প্রবণতা। এসব কারণে নির্ভেজাল ইফতারি খাবার কিনতেই পাওয়া যায় না। শুধু রাজধানীতেই ছোট-বড় পাঁচ সহস্রাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি রমজান উপলক্ষে আরও প্রায় ২০ হাজার মৌসুমি ইফতারি বিক্রেতা নানা আয়োজনে প্রস্তুতি নিয়েছেন। টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড, রাস্তা-ফুটপাথ, অলিগলি সর্বত্রই চলছে ইফতারি বাজার বসানোর সীমাহীন প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে চলছে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে ভেজাল খাদ্যসামগ্রী তৈরির নানা প্রস্তুতি। ইফতারি পণ্যে ক্ষতিকারক রং, ফরমালিন, পোড়া মবিল, পোড়া তেল, সার, কার্বাইড প্রভৃতি ব্যবহারের ফলে মানুষের মাঝে আগাম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে কাজের প্রয়োজনে যাদের বাসার বাইরে ইফতার করতে হয় এবং দোকানিদের তৈরি খাবারে ইফতার করতে হয় তাদের কোনো বিকল্পও নেই।

সুন্দর মুড়ি : আকারে বড় ও সাদা মুড়ি দেখতে সুন্দর। মুড়ি সাদা করতে ব্যবহূত হয় রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড। বিষাক্ত এই রাসায়নিক দ্রব্য চামড়া শোধনের জন্য ট্যানারিশিল্পে ব্যবহূত হয়। এসব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। মুড়ি বিক্রেতারা জানান, মুড়ি ভাজলে তা লাল হয় আর লাল মুড়ি ক্রেতারা পছন্দ করেন না। এজন্যই মুড়িতে নানা কেমিক্যাল ব্যবহারের দাবি করেন তারা।

টেক্সটাইল রঙের ছড়াছড়ি : পিয়াজু, বেগুনি, সবজিবড়া, বিভিন্ন কাবাব, আলুর চাপ— এসব ভাজাপোড়া খাবার আকর্ষণীয় করতে ব্যবহূত হচ্ছে ক্ষতিকারক টেক্সটাইল রং মানে কাপড়ে ব্যবহার্য রং। সাধারণত খাবারে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিশেষ রং মেশানো মেনে নেওয়া হলেও ওই রঙের দাম বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ কাজে ব্যবহার করছেন কম দামি কাপড়ে ব্যবহূত রং। অনেক সময় যে তেলে এসব ভাজা হচ্ছে তাতে মেশানো হচ্ছে পোড়া মবিলও। ফলে খাবার মচমচে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কম দামি এসব টেক্সটাইল রং কিডনির জন্য খুবই ক্ষতিকর। মবিলে ভাজা খাবার খেলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে দেহের ক্ষতি হয়। এতে ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে এবং পরিপাকসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়। একইভাবে জিলাপি চটজলদি বানাতে জিলাপির খামিরে মেশানো হয় হাইড্রোজ। জিলাপি মচমচে বানাতে ব্যবহূত হয় পোড়া মবিল। অন্যদিকে রংচঙে আকর্ষণীয় করে তুলতে লাল ও হলুদ কাপড়ের সিনথেটিক রং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কালো ছোলা সাদা করতেও দোকানিরা হাইড্রোজ দিয়ে তা সেদ্ধ করেন।

ফল কেন স্বাদু নয় : ইফতারে ভেজাল ফল আর দুধ খেলে দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগতে হয়। ফল, দুধ, মাছে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর ফরমালিন। বিশেষ করে আম, মালটা, খেজুর, আপেল, আঙ্গুর ও কমলায় এর ব্যবহার বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া তরল দুধে এই ক্ষতিকর রাসায়নিকটি মেশানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন। পুষ্টিবিদদের অভিযোগ, কার্বাইড ও ফরমালিন মেশানোর কারণে এখন কোনো ফলেই আগের মতো স্বাদ পাওয়া যায় না। ফলে ফরমালিন-কার্বাইড মেশানোর আতঙ্কে যারা প্যাকেট জুস কেনার কথা ভাবেন তারা আরও বেশি প্রতারণার শিকার হন। বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ফলের জুসে ফলের রসের ন্যূনতম উপাদান না থাকলেও নির্দিষ্ট ফলের রং, গন্ধ, চিনি ও পানি মিশিয়ে জুস হিসেবে তা প্যাকেট বা বোতলজাত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চিনির বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে স্নাইকোমেট নামের রাসায়নিক তরল পদার্থ। এ ছাড়া ইফতারে শরবতের ওপর নির্ভর করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টি, রং আর মাছে ব্যবহূত বরফ দিয়ে শরবত বানিয়ে নির্বিচারে বিক্রি চলছে।

রমজানে ভেজাল ঠেকাতে মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : খাদ্যপণ্যে ভেজাল ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে অভিযান পরিচালনা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল পুরান ঢাকার চকবাজার, বেগমবাজার ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ভেজালবিরোধী অভিযান চালায় র‌্যাব এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে যাত্রাবাড়ী এলাকায় র‌্যাবের অভিযান চলে। আর পুরান ঢাকার চকবাজারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মশিউর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে ডিএমপি। ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মশিউর রহমান জানান, দুপুরে চকবাজারের অভিযানে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিনটি ভোজ্যতেলের কারখানাকে দুই লাখ ও দুটি ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানাকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া দুটি পানির কারখানা এবং দুটি তেলের কারখানা সিলগালা করা হয়েছে। এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ফলের আড়তে র‌্যাব-১০ ও বিএসটিআই যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে। বাজারে আমদানি করা ফলগুলো স্বাস্থ্যসম্মত কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। ইথোফেন দিয়ে অপরিপক্ব ফল পাকানোর অভিযোগে ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং এক হাজার মণ আম ও ৪০ মণ নষ্ট খেজুর জব্দ করে ধ্বংস করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, রমজান উপলক্ষে ভেজালবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে যাত্রাবাড়ীতে ফলের আড়তে আসা আমের পরিপক্বতা ও তাতে কার্বাইড ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। পরে আমে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। জানা যায়, বুধবার রাতে পুরান ঢাকার চকবাজার বেগমবাজারের মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন কোমল পানীয় বাজারজাত করার অভিযোগে খালেদ মাহমুদ ও আবু সাঈদ রাজ নামে দুই ব্যবসায়ীকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলমের নেতৃত্বে মেসার্স দিদার অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের গোডাউনে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখানে মেয়াদোত্তীর্ণের পর টেম্পারিং করা প্রায় ২০ হাজার ক্যান জব্দ করা হয়। যেগুলোর দেড় থেকে দুই বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পণ্যের গায়ে নতুন তারিখ বসিয়ে বিভিন্ন সুপারশপে সরবরাহ করত প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া একই অভিযানে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মাদক ও নকল সিগারেট জব্দ করা হয়। যা আমদানি বা বিক্রির জন্য কোনো লাইসেন্স ছিল না প্রতিষ্ঠানটির।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow