Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ জুন, ২০১৮ ২৩:০৯
খালেদাকে সিএমএইচে ভর্তির প্রস্তাব বিএনপি চায় ইউনাইটেড হাসপাতালে
নিজস্ব প্রতিবেদক
খালেদাকে সিএমএইচে ভর্তির প্রস্তাব বিএনপি চায় ইউনাইটেড হাসপাতালে

কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পরিবর্তে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিতে চায় সরকার। এ প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ তথ্য জানান। তবে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা চান রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা হোক। বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিএসএমএমইউতে নিতে সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল বলে কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন জানিয়েছেন। যদিও খালেদা জিয়ার অনীহার কারণে তাঁকে সেখানে নেওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। এদিকে মানবিক কারণে ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে জাতীয় শহীদ মিনারে বিএনপি সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশ করতে দেয়নি পুলিশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী, খালেদা জিয়াকে ‘সর্বোচ্চ সেবা’ দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁরা সিএমএইচের      প্রস্তাবটি  দেবেন। তিনি বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) যদি  সেখানে (সিএমএইচ)  যেতে চান, আমরা  সেখান থেকেও তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে দিতে পারি। আমরা তাঁর চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়েছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালটির চেয়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিএমএইচ অনেক সমৃদ্ধ। সেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও রয়েছেন। তা ছাড়া সিএমএইচ অনেক ক্রান্তিকালে ভূমিকা রেখেছে। সেই বিবেচনায় সিএমএইচের প্রস্তাব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, তাঁর (খালেদা জিয়া) সিএমএইচে যাওয়া উচিত। আমরা এখন তাঁকে প্রপোজালটা দেব। তিনি কী রিঅ্যাকশন দেন, সেটা আমরা দেখব।’ ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার আবেদন বিবেচনার সুযোগ রয়েছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘এটার কোনো যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। সিএমএইচে না যাওয়ার মতো যুক্তি আমার মনে হয় থাকতে পারে না।’ খালেদা জিয়া বা তাঁর পরিবার সিএমএইচের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ‘পরিস্থিতি বুঝে’ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এর আগে কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেছিলেন, কারাবিধিতে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তা পেতে হলে খালেদা জিয়াকে আবেদন করতে হবে।

বিএনপির সংবাদ সম্মেলন : ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সব ব্যয়ভার নিজেরা বহন করবে ঘোষণা দিয়ে তাকে বেসরকারি হাসপাতালটিতে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। কারাবন্দী ব্যক্তির বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় জটিলতা নিয়ে কারা মহাপরিদর্শকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয় দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই বলে আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই যে, প্রয়োজনে চিকিৎসার সমুদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। আমরা দাবি করছি, কালবিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের পরামর্শ অনুযায়ী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হোক।’ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে সচিবালয়ে গেছেন। তার চিকিৎসার সমুদয় খরচ পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করবে বলে সেই আবেদন নিয়ে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেছেন। আর আমরা কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বলছি, আমাদের দলের চেয়ারপারসনের চিকিৎসার সব খরচ দল বহন করবে।’ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার অতীত নজির তুলে ধরে ড. মোশাররফ বলেন, ‘তথাকথিত ১/১১ সরকারের সময়েও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল। অথচ তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সেনাবাহিনীর প্রধানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি অনুমোদন ও অর্থ সংস্থানের ব্যাপারে এতদিনের সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক ও নিন্দনীয়।’ তিনি বলেন, ‘এখনো অনেক বন্দী বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ১/১১ সরকারের সময়ে শুধু শেখ হাসিনা নন, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সাহেব বেসরকারি প্রাইভেট হাসপাতালে এবং আরও অন্যদের স্কয়ার, এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’ সরকারের আচরণে দেশবাসী ক্ষুব্ধ হচ্ছে বলে দাবি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।

খালেদা জিয়ার ভাইয়ের আবেদন : খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করাতে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে এই আবেদনটি করেন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কানদার। আবেদনপত্রে খালেদা জিয়ার ভাই লিখেছেন, ‘বর্তমানে আমার বড় বোন খালেদা জিয়াকে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত। কারা অভ্যন্তরে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে দীর্ঘ কারাবাসে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।’ আবেদনপত্রে আরও বলা হয়, ‘গত ৯ জুন কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিসাপেক্ষে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কারা অভ্যন্তরে তার (খালেদা জিয়া) শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। উক্ত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে খালেদা জিয়া গত ৫ জুন ‘মাইল্ড স্ট্রোকে’ আক্রান্ত হন। ফলে ভবিষ্যতের জন্য এ ধরনের বিষয় বড় ধরনের ঝুঁকির পূর্বাভাস বহন করছে। তাকে অনতিবিলম্বে ঢাকার ‘ইউনাইটেড হাসপাতালে’ ভর্তি করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি।

 তাই খালেদা জিয়ার এ ধরনের সব চিকিৎসা ব্যয় আমরা নিজ/পারিবারিকভাবে বহন করব। এ কারণে খালেদা জিয়াকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা প্রদানের অনুমতির জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি’’।

বিশিষ্টজনদের সমাবেশে বাধা: কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশিষ্টজনদের মৌন অবস্থান কর্মসূচি পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে। গতকাল সকালে দুই দফায় পৃথকভাবে বিশিষ্টজনেরা সেখানে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশের বাধায় সরে যেতে বাধ্য হন তারা। প্রথম দফায় আসা দলটি পুলিশের বাধায় সঙ্গে আনা ব্যানারও খুলতে পারেনি। আর পরের দলটি ২০ মিনিটের মতো শহীদ মিনারের সিঁড়িতে অবস্থান নিতে সড়্গম হন। বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শত নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে এই অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করার কথা ছিল।

সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে ৫০ জনের মতো বিশিষ্টজন শহীদ মিনারে সমবেত হন। তারা সেখানে যাওয়া মাত্রই পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। পুলিশ বাধা দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখান থেকে চলে যান তাঁরা। এ সময় অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক জেড এন তাহমিদা খাতুন, অধ্যাপক তাজমেরি এন ইসলাম, ডা. এম এ আজিজ, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, কবি আবদুল হাই শিকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, একটি মানবিক আবেদন নিয়ে আমরা এখানে এসেছিলাম। আমরা চাই, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে যেন মানবিক কারণে মুক্তি দেওয়া হয়। আমাদের সঙ্গে আনা ব্যানারে সেই কথাটিও লেখা ছিল। কিন্তু তারা পুলিশ ব্যানারটি খুলতেই দেয়নি। এখানে দাঁড়াতেও দেয়নি, বসতেও দেয়নি।

এরপর বেলা ১১টার দিকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিশিষ্টজনদের আরেকটি দল শহীদ মিনারে এসে পৌঁছায়। এসময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক মেজবাহ-উল ইসলাম,  হোসনে আরা, আখতার হোসেন খান, আবদুর রশীদসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন শিক্ষক ও সাংবাদিক। তাঁরা শহীদ মিনারের সিঁড়িতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট অবস্থান  নেন। পরে পুলিশ এসে তাঁদের সেখান থেকেও সরে যাওয়ার অনুরোধ করে। ওই সময় তাঁরা পুলিশের উদ্দেশ্যে বলেন, থাকার জন্য আসিনি, চলে যাব।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow