Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৪ মার্চ, ২০১৮ ২৩:২৯
নীল বিষে সব শেষ
মির্জা মেহেদী তমাল
নীল বিষে সব শেষ

সাজিদের জন্মদিন। বাসাভর্তি মেহমান। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের কেউ বাদ নেই। বন্ধুবান্ধব সবাই হাজির। ভীষণ হৈ-হুল্লোড়, এলাহি কাণ্ডকারখানা। বাবা দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, তার ব্যবসায়ী বন্ধুরাও জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এসেছেন। বাবা-মায়ের মেধাবী সন্তান সাজিদের জন্মদিন এবার পালন করা হচ্ছে একটু ঘটা করেই। সাজিদের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার ঘটনাটি জন্মদিনের আনন্দের মাত্রা বাড়িয়েছে কয়েক ধাপ। মেধাবী ছেলেটি তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছিল। হঠাৎ ‘মাদকঝড়’। সম্ভাবনার সব পথ হারিয়ে ফেলে ছেলেটি। এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়া হয় না। হয়নি ডাক্তার হওয়া। পরে যা হওয়ার তাই হয়েছে। মাদক কিনতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে বার বার। বাড়িঘর থাকলেও রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটেছে মাদকাসক্ত এই সন্তানের কারণে। মা এখন নানাবাড়িতে থাকেন। ছোট ভাইটি আমেরিকায় গিয়ে যেন পালিয়েছে। ছারখার পুরো পরিবার।

দেশের সাবেক এক রাষ্ট্রপতির মেধাবী সন্তান। পেশায় চিকিৎসক। সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সংসদ সদস্য থাকতেই তার অকালমৃত্যু হয়। তার সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন নিষিদ্ধ মাদক ফেনসিডিলের নেশাকে। মাদকের পাল্লায় পড়ে রাষ্ট্রপতিপুত্র থেকে শুরু করে গরিব ঘরের মেধাবী সন্তানটিও আজ ‘শেষ’ হয়ে যাচ্ছে মর্মান্তিকভাবে। সে নিজে শেষ হচ্ছে; পরিবার শেষ হচ্ছে; শেষ হচ্ছে গোটা সমাজ। কারণ, দেশের যুবসমাজ আজ নীল হয়ে আছে মাদকের বিষে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন সব সত্য, যা শিউরে ওঠার মতো। ভাবতে গিয়ে আঁতকে উঠতে হয় এ জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ এক নীরব ঘাতকের মতো ভিতরে ভিতরে শেষ করে দিচ্ছে। সব দেখেশুনে বলতে হয়, এ জাতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম মাদক। তছনছ পরিবার : বাবা বড় ব্যবসায়ী। বড় ছেলে সাজিদকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন ছিল তার। একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন ছেলেকে। কিছু দিন সব ঠিকঠাক। হঠাৎ ছেলেটির পরিবর্তন। চোখ এড়ায় না মায়ের। ঘরের ভিতর দু-তিন জন বন্ধু নিয়ে কী করে সাজিদ! ভাবতে শুরু করেন সাজিদের মা। ছেলের বন্ধুবান্ধবের কাছে জানতে চান। তারা কিছু জানায় না। হঠাৎ একদিন থানা থেকে সাজিদের বাবার কাছে ফোন আসে। ‘আপনার ছেলে সাজিদ এখন লালবাগ থানায়। আপনাকে থানায় আসতে হবে।’ পুলিশের এমন ডাক পেয়ে সাজিদের বাবা হন্তদন্ত হয়ে থানায় যান। আর সেখানে গিয়ে যা জানলেন, তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। পুলিশ তাকে জানায়, সাজিদের পকেটে ২০টি ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া গেছে। আকাশ ভেঙে পড়ে বাবার মাথায়। থানা ম্যানেজ করে সাজিদকে নিয়ে বাসায় চলে এলেন। সাজিদের বাবার সঙ্গে মায়ের এ নিয়ে তর্ক। ঝগড়া। ‘তুমি আমার ছেলেকে নষ্ট করেছ। ঠিকমতো দেখভাল করতে পারোনি।’ এমন সব কথা বলে যান সাজিদের বাবা। মা তার সন্তানের পিছু নেন। কোথায় যায়, কী খায় তা এদ্দিন না খেয়াল করলেও থানা পুলিশ হওয়ায় তাদের টনক নড়ে। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারে না। জানতে পারে না কিছু। সাজিদকে নিয়ে বাড়িতে অশান্তি চরম আকার ধারণ করতে থাকে। বাবা-মায়ের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। একদিন সাজিদের বাবার হাত উঠে গেল তার মায়ের ওপর। ব্যস, যা হওয়ার হয়েছে। সাজিদের বাবার এ আচরণ নিয়ে সাজিদের নানার বাড়ি লোকজন ক্ষুব্ধ। একদিন তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

সাজিদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। একসময় ঘরে আটকে রাখা হলো। এরপর তার গৃহবন্দী জীবন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হয়েছিল তার। না চাইতেই মা-বাবা সবই দিয়েছেন তাকে। এখন ১০০-২০০ টাকার জন্য এর-ওর কাছে হাত পাততে হচ্ছে ছেলেটিকে। রাজধানীর কল্যাণপুরে বাবার পাঁচ তলা বাড়ি। ছোট ভাই পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব। ছোট ভাই লেখাপড়া করছেন সেখানেই। ‘অস্বাভাবিক’ জীবন থেকে ফেরাতে বড় ছেলেকে বছর চারেক আগে বিয়ে দেওয়া হয়। স্ত্রী চাকরি করতেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। ঘর আলো করে আসে নাতিও। তবে শান্তি ফেরেনি। টাকার জন্য স্ত্রী, সন্তানের ওপর চড়াও হয় হিংস্র পশুর মতো। সন্তান ও সংসার সামলাতে স্ত্রী চাকরি ছেড়েছেন। বাবার চেষ্টায় কোনোমতে টিকে আছে সেই সংসার। নিজের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেই প্রথমবারের মতো ইয়াবার টেস্ট নেন সাজিদ। প্রথম দিন তার বন্ধুরা বাসায় আনলেও এখন তার নিজেরই যেতে হয়। ফেনসিডিলে আসক্ত আরেক মেধাবী যুবকের জীবনের কাহিনী আরও করুণ। তার বাবা বেঁচে নেই। মা-বাবার একমাত্র ছেলে তিনি। রাজধানীর মগবাজারে পাঁচ তলা বাড়িতে বসবাস। সেই বাড়িতে আছেন মা, ছোট বোন আর স্ত্রী। বাংলামোটর ও বারিধারায় আরও দুটি বাড়ি আছে তাদের। বেশকিছু জমিও রেখে গেছেন বাবা। এসব কিছুর খোঁজখবর নেই ছেলেটির। মালয়েশিয়া থেকে বিবিএ শেষ করে দেশে ফিরে তিনি এখন ইয়াবার নেশায় বুঁদ। নাম-ঠিকানা না প্রকাশের শর্তে এই যুবক বর্ণনা করেন তার ঘটনা। ২০০৩ সালে বাবা মারা যান। মায়ের অনুরোধে দেশে ফিরে বাবার জমির ব্যবসা ও সম্পত্তির দেখভালে মনোযোগ দেন তিনি। সময়টা ছিল ২০০৬। এক চাচাতো ভাই ও কয়েকজন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ফেনসিডিলের বোতলে প্রথম চুমুক দেন। আর ফিরতে পারেননি। যুবক বলেন, ‘হাতে বাবার অনেক টাকা। নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। ভুল করছি, তা-ও বুঝিনি। যখন বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে, তখন আর ফিরতে পারছি না।’ ৩০ বছরের এই যুবক কেঁদে বলেন, ‘আমি আমার বাবার অথর্ব সন্তান। আমাদের জমিজমা কোথায় আছে, তা-ও আমি ঠিকমতো জানি না। সারা দিন মা আমার জন্য কাঁদেন। অনেক সম্পত্তি এখন অন্যের দখলে। এত টাকা ছিল, আর এখন সংসার চালানোই দায়।’ এই ছেলেটিকেও ফেরানোর চেষ্টা করে চলেছেন তার অসহায় মা। ২০১০ সালে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু স্ত্রীর কাছে মাদকাসক্তি ধরা পড়ার পর বিপর্যস্ত তার দাম্পত্য জীবন। আইন বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করা স্ত্রী স্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য নেশা ছাড়ার শর্ত দিয়েছেন তাকে। সন্তানের মুখ দেখতে হলেও মানতে হবে এই শর্ত। ছেলেটির মা কেঁদে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে আছি। এখন মনে হচ্ছে, আমার সব শেষ। আমি ছোট মেয়েটাকে নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসছি। ছেলেটা তার বাবার কিছুই ধরে রাখতে পারবে না।’ শুধু এ দুই যুবকের ঘটনা নয়, আছে অসংখ্য উদাহরণ। দেশের লাখ লাখ পরিবারে চলছে মাদকের দহন। ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমজীবীসহ সব শ্রেণির মানুষই মাদকের নীল বিষে আক্রান্ত। ভেঙে যাচ্ছে সম্পর্কের বন্ধন। মাদকের ছোবল শুধু কারও একটি জীবন বিষাক্ত করছে না, গ্রাস করছে একেকটি পরিবার। একটি সন্তান, একটি মানুষ মাদকাসক্ত হলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে পুরো পরিবার। অবস্থা এমন হয় যে, একেকটি পরিবারে তৈরি হয় বিচ্ছেদের দেয়াল। মা-বাবার আদরের সন্তান হয়ে যায় সবার চোখের বালি।

মনোচিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বনাশা ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, প্যাথেড্রিন, সিসা, মদ, বিয়ার, কোকেন, গাঁজাসহ অনেক কিছু এখন পৌঁছে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের হাতে। সঙ্গদোষেই মাদকাসক্তির ঘটনা ঘটছে বেশি। তবে পরিবারে অশান্তি, সামাজিক অনুশাসন মেনে না চলা, অভিভাবকের অবহেলা, আশপাশের পরিবেশ ও মাদকের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া আইনি নজরদারিতেও বড় রকমের দুর্বলতার কথা বলেন অনেকে। অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, পরিবারে সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার দায় মা-বাবার হলেও এখন অনেক পরিবারে মা-বাবা নিজেরাই সন্তানদের বিভ্রান্ত করছেন। তারা নিজেরাই নানা অবক্ষয়ে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অসামাজিকতায় নিজেরাই গা ভাসিয়ে দিয়ে সন্তানকে সঠিক পথে রাখার নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেন কিংবা নিজেরাই সন্তানকে বিপথগামী করে তোলেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই পাতার আরো খবর
up-arrow