Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৬ মে, ২০১৮ ২৩:১০
আস্থা ও নির্ভরতায় বাংলাদেশ
শিমুল মাহমুদ, সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে

মৌলিক চাহিদার কোনো কিছুই জোটে না তাদের। লিকলিকে শরীরে ভালো কোনো কাপড় নেই। নিয়মিত তিন বেলা খাবার জোটে না অনেকেরই। সীমাহীন দারিদ্র্য আর রোগজর্জরিত সেন্ট্রাল আফ্রিকার মানুষের ভরসাস্থল বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ, শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে স্থানীয় মানুষকে। তাদের কষ্ট লাঘবে কাজ করছেন শান্তিরক্ষীরা। ফলে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে। এর মধ্য দিয়ে হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বদলে গেছে সেন্ট্রাল আফ্রিকার অসংখ্য মানুষের জীবন। বিশাল ভূখণ্ডের পুরো দেশটিতে সরকারি হাসপাতাল সুবিধা নেই বললেই চলে। ফলে মানুষের কষ্টের কোনো শেষ নেই। সেই কষ্ট লাঘবে এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। দেশটির মানুষ এইচআইভিসহ নানা রোগে ভুগছে প্রতিনিয়ত। ম্যালেরিয়ায় মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। আছে চর্মরোগসহ নানা অসুস্থতা। এ ছাড়া নিজেদের দ্বন্দ্বে গোলাগুলি করে আহত হয়ে অনেকে আসে হাসপাতালে। এমন একটি জনপদের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের একটি অস্থায়ী হাসপাতাল। বাংলাদেশ বিভিন্ন ইউনিটে অনেক হাসপাতাল পরিচালনা করে।

ব্যানব্যাট-৪-এর নিয়ন্ত্রণে লেভেল-১ হাসপাতালটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এখানে গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, ডেন্টালসহ সব ধরনের রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। রয়েছে আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রের ব্যবস্থাও। নির্ধারিত দিনে লাইন ধরে এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। আহত হয়েও লোকজন আসছেন। তারা বলছেন, ‘এ হাসপাতালের চিকিৎসা আমাদের একমাত্র ভরসা।’ জানা গেছে, এই অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সসহ ৪৮ জনের জনবল রয়েছে। এখানে আছে চিকিৎ্সার আধুনিক সব যন্ত্রপাতিও। সেনা সদরের লে. কর্নেল আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের মিডিয়া টিমের সদস্যরাও চিকিৎসা কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ। সেন্ট্রাল আফ্রিকার রাজধানী বাঙ্গি থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম বোয়ার এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালটি স্থানীয়দের আস্থা ও ভরসাস্থল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। লে. কর্নেল আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের একেকটা মিশন একেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। এখানে আমাদের শান্তি প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করতে হচ্ছে।’ গত মঙ্গলবার বোয়ারে ব্যানব্যাট-৪-এর উদ্যোগে সিভিল মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন (সিমিক) কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এর আওতায় মেডিকেল ক্যাম্প ছাড়াও স্থানীয়দের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। সিমিক কার্যক্রমে স্থানীয় শিশুদের মাঝে স্কুলব্যাগ, টিফিন বক্স, পানির বোতল, গেঞ্জি, ফুটবল, বিস্কুট দেওয়া হয়। বিস্কুট এখানকার বাচ্চাদের অনেক প্রিয়। আমাদের যাত্রাপথে গাড়ি যেখানেই থেমেছে সর্বত্রই বিস্কুটের জন্য ঘিরে ধরেছে শিশুরা। মেডিকেল ক্যাম্পের ডাক্তার মেজর তাসলিমা হক বলেন, ‘এখানে মানুষ এত কষ্টে আছে ভাবা যায় না। মৌলিক অধিকারের কিছুই তারা পায় না। তাদের জন্য কাজ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

ভরসা ও নির্ভরতায় বাংলাদেশ : সংঘাতপূর্ণ সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকে ভরসা ও নির্ভরতার জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। স্থানীয় জনগণের মনোভাব দেখেই তা বোঝা যায়। মঙ্গলবার দুপুরে আমরা দেখা করতে যাই বোয়ারের স্থানীয় মেয়র লাজার নামবেলার সঙ্গে। তিনি নিজ অফিস ছেড়ে বাইরে এসে আমাদের রিসিভ করেন। তিনি আশা করেন, দেশে শান্তি না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকে থাকুক। এতে তাদের অনেক উপকার হয়।

বোয়ার থেকে রাজধানী বাঙ্গিতে ফেরার আগে কথা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানব্যাট-৪-এর কনটিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল মো. এমদাদ উল্লাহ ভূইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখানে জাতিসংঘের আস্থা ও নির্ভরতার জায়গায় রয়েছে। শুরুতে এখানে আমাদের দেশটির মেইন সাপ্লাই রুটের (এমএসআর) একটা অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন অনেক গুণ বাড়িয়ে পুরো ৬১০ কিলোমিটারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির অনেক দুর্গম এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আমাদের শান্তিরক্ষীরা। আশা করছি, আমাদের এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশটিতে একদিন শান্তি ফিরে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘১৯৮৮ থেকে গত ৩০ বছরে বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশের ১৩০ জন শান্তিরক্ষী জীবন দিয়েছেন। তাদের মহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শান্তি ফিরে এসেছে। এখানেও একসময় শান্তি আসবে।’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow