Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৭ মে, ২০১৮ ২৩:১৭
কেমন বাজেট চাই
চার কোটি মানুষ কর দিতে পারেন
—এ কে আজাদ
রুহুল আমিন রাসেল
চার কোটি মানুষ কর দিতে পারেন

দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক সচ্ছলতার বাস্তবতায় করজালের বাইরে থাকা চার কোটি মানুষ আয়কর দিতে পারেন এবং তাদের করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা উচিত বলে মনে করেন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ। তিনি রাজস্ব প্রশাসনকে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করে সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ‘সবাইকে সচেতন করতে পারলে মানুষ কর প্রদানে আগ্রহী হবেন। কর না দিলে দেশ চলবে কীভাবে। দেশ এখন ভ্যাটের ওপর চলছে।’ ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক এই সভাপতি দেশের শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার। প্রতিষ্ঠানটির তেজগাঁও কার্যালয়ে গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কে আজাদ বলেন, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা উচিত। দেশে এখন মাত্র ৩১ লাখের কিছুটা বেশি টিআইএনধারী আছেন। এর মধ্যে মাত্র ১৮ লাখ করদাতা বার্ষিক আয়করবিবরণী দাখিল করেছেন। এ সংখ্যা বাড়াতে হবে। শিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্টিজের (বিসিআই) সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের বাজেটের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, করপোরেট করহার কমানোর ঘোষণা। বিশেষ করে পাবলিক লিস্টেট কোম্পানির করপোরেট কর কমানো হলে বড় বড় ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে। তখন পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়বে। এটা অন্যতম ভালো দিক। তবে এবারের ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উদ্বৃত্ত হলো ৬০ হাজার কোটি টাকা। ৬০ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত বাজেট করার মতো বাস্তবতা আমাদের আছে কি না তা ভাবতে হবে।’ এ কে আজাদ বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি এখন চিন্তা করতে হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট নিয়ে। এই ভ্যাট থেকে সামনের অর্থবছরে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি আয় আসবে। আয়কর থেকে আদায়ের চিন্তা করা হচ্ছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। আর শুল্ককর হিসেবে আদায়ের চিন্তা করা হচ্ছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রাকে আমি বাস্তবসম্মত মনে করছি। কারণ রাজস্ব আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ ধরা হয়েছে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটা বড় ফ্যাক্টর। এটাও সরকারের জন্য বিশাল চিন্তার ব্যাপার।’

এই শিল্পোদ্যোক্তার মতে, ‘দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখন সন্তোষজনক। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এখন ২৩ শতাংশ। প্রতিবছর এই বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে যানজট, অবকাঠামো, রেলে পণ্য পরিবহন সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। বন্দরসুবিধা বাড়ানো দরকার। তার দাবি, আজকে দেশে যে যানজট হচ্ছে এর মূল করণ বিপুলসংখ্যক গাড়ি আসছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। কিন্তু আমাদের রাস্তাঘাটে তেমন সক্ষমতা আসেনি। রেলের প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া উচিত। রেলকে যুগোপযোগী করা। নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো। পানগাঁও বন্দর কার্যকর করা। এ ক্ষেত্রে পানগাঁও বন্দরের সমস্যা সমাধানে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর না করে  মোংলা বন্দরকে সচল করা প্রয়োজন। এই বন্দরের আধুনিকায়ন এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, মোংলায় একটা বন্দর আছে। অথচ এটাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মোংলা বন্দরে পণ্য পাঠাতে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে হবে। এখন মোংলা বন্দর ড্রেজিং করে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিলে এটিও সচল হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। তার মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ বেশি হওয়ায় সেখানে উড়ালসড়ক নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী উড়ালসড়কের চিন্তা করেছেন। তবে এই প্রকল্প শুধু সরকারের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এখানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি প্রকল্প হিসেবে দেশি-বিদেশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ দরকার। এখানে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা দরকার। এ কে আজাদ বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের চিন্তা করছেন। আমি মনে করি এই বাজেটের পুরোটা হয়তো বাস্তবায়ন করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে বাজেট সংশোধন করতে হবে। কারণ করজাল যদি বাড়ানো না যায়, তাহলে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মতো আগামী বছরও বাজেট সংশোধন করতে হবে। চলতি অর্থবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হতে যাচ্ছে। রাজস্ব বাজেট সংশোধন হওয়ার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজস্ব আয়ের ওপর ভরসা করে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়। সেই প্রকল্পগুলো শুরু করেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পাঁচ বছরের প্রকল্প ১৫ বছর লেগে যাচ্ছে। তাতে খরচ হচ্ছে তিন গুণ। এ জায়গাগুলোতে সমস্যা হচ্ছে। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে আমি মনে করি, বাজেট যেটা বাস্তবায়নযোগ্য, সেটাই গ্রহণ করা উচিত। কারণ এনবিআরের ওপর যে রাজস্ব আদায় নির্ধারণ করা হয়, প্রতিবছরই তা আবার সংশোধন করা হয়। এ কারণে প্রকল্পগুলো সময় মতো টাকা পায় না।’ এফবিসিসিআইর সাবেক এই সভাপতি মনে করেন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ১০টি উদ্বোধন করেছেন, এই ১০টির কাজ কিন্তু শেষ পর্যায়ে, বিশেষ করে মিরসরাই। সেখানে যাতে আগামী বছর জমি বরাদ্দ দেওয়া যায়, সেটা বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা দরকার। একই সঙ্গে জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ সমস্ত অবকাঠামো সুবিধা নিয়ে ওয়ানস্টপ সেবা চালু করতে হবে। এটা করা হলে বিনিয়োগ যথেষ্ট বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে বাজেটে বিশেষ জোর দেওয়া দরকার। উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সরকার ভালো ভালো অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো বিদ্যুৎ। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে দায়িত্বে আসার পর যেখানে যা রেখে গিয়েছেন, ২০০৯-এ এসে সেখানেই পেয়েছেন। আর ২০০৯ সালে পাওয়া তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুেক প্রধানমন্ত্রী ১৮ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছেন। এটা বাংলাদেশের বিরাট অর্জন। পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এর বাইরেও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য যেসব প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়েছেন, তাতে গ্রামের মানুষ এখন ভালোই আছেন। বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির ৪ শতাংশ আসছে সেবা খাত থেকে, ৩০ শতাংশ আসছে শিল্প খাত থেকে, বাকিটা আসছে কৃষি খাত থেকে। এখন কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসছে। এর মূল কারণ হচ্ছে শিল্পায়ন। আর শিল্পায়ন হচ্ছে বলেই আজকে সেবা খাত গতি আসছে। আর এই সেবা খাত বলতে আমি বোঝাতে চাইছি টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ। সব মিলিয়ে অর্থনীতির সব দিকে একটা গতি এসেছে।’

এই পাতার আরো খবর
up-arrow