Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১১ জুলাই, ২০১৮ ২২:১০ অনলাইন ভার্সন
থাই কিশোরদের হারিয়ে যাওয়া ও আমাদের শিক্ষা
মোতাহার হোসেন রবি:
থাই কিশোরদের হারিয়ে যাওয়া ও আমাদের শিক্ষা

থাইল্যান্ডেরর অত্যন্ত দুর্গম গুহা লুয়াং নং নন। গত ২৩ জুন গুহাটিতে ১২জন খুদে ফুটবলার নিখোঁজ হয়। যাদের বয়স ১১ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে এবং তাদের সহকারি কোচ এক্কাপোল জানথাওংয়ের বয়স ২৫ বছর। তারা ’মু পা’ নামের একটি ফুটবল দলের সদস্য। 

৯ দিন সেখানে আটকে থাকার পর ২ জুলাই ব্রিটিশ ডুবুরি রিচার্ড স্ট্যানটন ও জন ভলানথেন প্রথম তাদের সন্ধান পান। গুহাটি প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং অত্যন্ত আঁকাবাঁকা হওয়ার দরুন যে কেউ সহজেই পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। 

থাম লুয়াং-খুনাম নাঙ্গনন ন্যাশনাল পার্কের একজন কর্মী ওই দিন দুপুর তিনটার দিকে লক্ষ্য করেন যে গুহার প্রবেশ-মুখে ১১টি সাইকেল রাখা আছে।
তখনই তিনি এবং তার দল অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। ওই কিশোরদের একজনের পিতামাতাও ন্যাশনাল পার্কের কর্মকর্তাদের জানান যে তারা তাদের ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

তারা ধারণা করেন গুহার ভেতরে ছেলেগুলো পথ হারিয়ে ফেলেছে। এরপর ২৫শে জুন রবিবার সকাল একটা থেকে গুহার ভেতর তাদের খোঁজার কাজ শুরু হয়। 

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়, প্র্যাকটিস শেষ হয়ে যাওয়ার পর ফুটবলের দলের একজন সদস্যের জন্যে সারপ্রাইজ পার্টির আয়োজন করতে তারা গুহার ভেতরে ঢুকেছিল। গুহায় না যাওয়া ওই দলের এক সদস্য জানান, এর আগেও তারা আরো তিনবার গুহার ভেতরে ঢুকেছিলেন, এবং বৃষ্টির মওসুমে কখনো তারা গুহার ভেতরে যান নি। কিন্তু যেদিন ফুটবল দলটি গুহার ভেতরে ঢোকে তারপর থেকেই প্রচুর বৃষ্টি হতে শুরু হয়। সেখানে জঙ্গলের জমে যাওয়া পানিও ঢুকে যায় গুহার ভেতরে। পানি এতো বেড়ে যায় যে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় গুহায় প্রবেশের মুখ। গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা খুব দ্রুত বেড়ে গেলে কোচসহ কিশোর ফুটবলাররা ভেতরে আটকা পড়ে যান। আরো উঁচু জায়গা খুঁজতে খুঁজতে তারা চলে যান গুহার আরো গভীরে।

এরপর তাদের সন্ধান পাবার পর নানাভাবে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলে কিন্তু সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে এবং ৭জুলাই শনিবার উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়। কিন্তু গত রবিবার রাত থেকে আবারো প্রবল বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর গুহার ভেতর পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে উদ্ধারকাজ আরো কঠিন হতে পারে এমন আশঙ্কায় রবিবারই এই উদ্ধার অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
 
এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক অভিযান - যাতে ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়া সহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশের উদ্ধারকারী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

এরপর নব্বই জন দক্ষ ডুবুরির একটি দল, যাদের ৪০ জন থাইল্যান্ডের এবং বাকিরা বিভিন্ন দেশের – তারা সবাই মিলে ওই উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। তারা গুহার ভেতরে অন্ধকার, সংকীর্ণ এবং জায়গায় জায়গায় পানিতে ডুবা পথ দিয়ে কিশোরদের হাঁটিয়ে বা ডুব-সাঁতারের মাধ্যমে  প্রবেশমুখে নিয়ে এসেছে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই কিশোরদের এমন বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়। যেটা কিনা অভিজ্ঞ ডুবুরিদের জন্যও ভীষণ কষ্টকর ছিল। এই অভিযান প্রক্রিয়া জুড়ে ছিল হাঁটা, পানির ভেতর দিয়ে চলা, বেয়ে ওঠা, এবং পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে দড়ি ধরে এগিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সব কাজ।
সব ডুবুরিই বাড়তি সতর্কতার জন্য মুখোশ ব্যবহার করেন। প্রতিটি কিশোরকে দুইজন করে ডুবুরি সাহায্য করেছে। তারা ওই কিশোরের অক্সিজেন সরবরাহের ট্যাঙ্কও বহন করেন।

তবে গুহার সবচেয়ে জটিল অংশটি হল অর্ধেক পথের "টি-জংশন"। যেটা এতোটাই সংকীর্ণ যে তার ভেতর দিয়ে যাওয়ার জন্য ডুবুরিদের অক্সিজেন ট্যাঙ্কটি খুলে ফেলতে হয়।

ওই সুড়ঙ্গে রয়েছে আরেকটি স্থান যার নাম দেয়া হয়েছে চেম্বার থ্রি’। যেটা ডুবুরিদের জন্য ফরোয়ার্ড বেইজে পরিণত হয়।

সেখানে কিশোররা বাকি পথ পাড়ির দেয়ার আগে কিছু সময় জিরিয়ে নিতে পারে। পরে তারা পায়ে হেঁটে সহজেই প্রবেশমুখে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে তাদের চিয়াং রাইয়ের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া এক প্রাক্তন থাই নৌবাহিনীর ডুবুরির মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই যাত্রা কতোটা বিপজ্জনক ছিল। সামান গুনান নামে ওই ব্যক্তি শুক্রবার গুহার মধ্যে দিয়ে কিশোরদের অক্সিজেন ট্যাঙ্ক দিয়ে ফিরছিলেন। এ সময় পানির ভেতরেই অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান তিনি।

উদ্ধার অভিযানের প্রধান বলেন, অভিযানের দ্বিতীয় দিনটি প্রথম দিনের তুলনায় আরো মসৃণভাবে পরিচালিত হয়েছে। প্রতিবার ডুবুরিদের দুঘণ্টারও কম সময় লেগেছে। উদ্ধারকারীরা গুহায় ঢোকার আগে বিশাল পাম্পিং মেশিন দিয়ে গুহার ভেতরের পানির স্তর নীচে নামিয়ে আনা হয়। যা পুরো যাত্রাকে আরো সহজ করে তোলে। এর পরই আসে সেই বহু কাঙ্খিত স্বস্তি। ধাপে ধাপে উদ্ধার করা হয় পুরো দলকে।

পুরো উদ্ধারাভিযান শেষে একটি বিষয় আবারো পরিষ্কার হয় যে; বিপদে ভড়কে না গিয়ে বরং মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক পরিকল্পনা ও দলগতভাবে সমস্যার মোকাবেলা করার মাধ্যমে যেকোন কঠিন বিপদকেও জয় করা সম্ভব।

লেখক- শিক্ষার্থী, সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।

(পাঠক কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়) 

বিডি-প্রতিদিন/ ই-জাহান

আপনার মন্তব্য

up-arrow