Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৬ এপ্রিল, ২০১৮ ২১:৩৪
স্বর্ণদ্বীপে সম্ভাবনার হাতছানি
শিমুল মাহমুদ
স্বর্ণদ্বীপে সম্ভাবনার হাতছানি

যতদূর চোখ যায় সামনে বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর। মাঝে মাঝে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বিশাল ঝোপঝাড়। দেখে মনেই হবে না এখানে এক সময় বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলস্রোতের দাপাদাপি ছিল। সেই সাগরের বুকে জেগে উঠেছে এক বিস্ময়কর দ্বীপ। আয়তনে যা প্রায় সিঙ্গাপুরের সমান। দৈর্ঘ্যে ২৮ কিলোমিটার, প্রস্থে ১৪ কিলোমিটার। স্বর্ণদ্বীপ নামের এই বিশাল দ্বীপের স্বচ্ছ পানির পুকুরে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো হাঁসের ঝাঁক। মহিষ চড়ছে খোলা মাঠে। গরু, ভেড়া. হাঁস, মুরগি, কবুতরের খামার রয়েছে জায়গায় জায়গায়। এখানে রয়েছে সবজি বাগান, ধানসহ নানা ধরনের শস্য। ১৯৭৮ সাল থেকে গত ৪০ বছরে পর্যায়ক্রমে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে উঠেছে এই বিশাল ভূখণ্ড। চারপাশে অথই জলের প্রবাহ। মাঝখানে স্বর্ণ সম্ভাবনার এই বিশাল ভূখণ্ডে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ১৯১২ সালে স্বর্ণদ্বীপ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বরাদ্দ দেয় সরকার। ২০১৪ সাল থেকে সেখানে সেনাসদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এর পাশাপাশি সেনাবাহিনী এখানে চারটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করেছে। পাঁচটি বহুতল সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। এরমধ্যে দুটি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ শেষে এগুলোর বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয়েছে। তৃতীয়টির নির্মাণ কাজ চলছে। তৈরি হচ্ছে নানা স্থাপনা। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ স্বর্ণদ্বীপে ৩১ শয্যার একটি হাসপাতাল ভবন, অফিসার্স মেস, স্টাফ কোয়ার্টারসহ তিনতলা ছয়টি ভবনের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব ভবন নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।      

পাঁচ বছরের প্রচেষ্টায় জনবিরল এলাকাটি বাসযোগ্য ও সবুজে সুশোভিত হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা হয়েছে পরিকল্পিত বনায়ন, সাইক্লোন শেল্টার, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, নারকেল বাগান, ঝাউ বাগান। এখানে রয়েছে সবজি বাগান, ধানসহ নানা ধরনের শস্য। ২০টি খামারে প্রায় ১৩ হাজার মহিষ, ১৬ হাজার ভেড়া ও ৮ হাজার গরু পালন করা হচ্ছে। এসব খামার থেকে উৎপাদিত দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করতে একটি কারখানাও স্থাপিত হয়েছে। সমতল ভূমির এই দ্বীপে মাছ চাষের জন্য তৈরি করা হয়েছে অনেক পুকুর। সব মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ‘স্বর্ণদ্বীপ’ যেন সত্যিকারের স্বর্ণদ্বীপে রূপান্তর হচ্ছে। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে নৌপথে চলাচলের জন্য সেনাবাহিনী নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করেছে ৩টি ট্রলার। এ ছাড়া ভারী যানবাহন পারাপারের জন্য এলসিটি ও এলসিইউ জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত ‘স্বর্ণদ্বীপে’ সরেজমিন গিয়ে এমনই চিত্র দেখা যায়।

২০১৩ সাল থেকে স্বর্ণদ্বীপে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা অবস্থার উন্নতি, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। ইতিমধ্যে স্বর্ণদ্বীপে গড়ে উঠেছে মিলিটারি ফার্ম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা, স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে সেখানে। বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে জেনারেটরের পাশাপাশি ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, যদি সমুদ্র রিক্লেইম করে ভূমি উদ্ধার করা যায়, তাহলে বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে আসবে এই স্বর্ণদ্বীপ। এজন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশে এমন জায়গা কোথাও নেই। এ জায়গাটা দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। এই ধরনের চর না ভাসলে বাংলাদেশের এত মানুষের জায়গা হবে কোথায়? এটা আল্লাহর রহমত। স্বর্ণদ্বীপ না দেখলে বাংলাদেশ দেখাই আমার বাকি থেকে যেত। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর গত ৫০ বছরে সমুদ্র রিক্লেইম করে বিপুল পরিমাণ ভূখণ্ড সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই জেগে উঠছে আরেক বাংলাদেশের সমান ভূখণ্ড।

 

‘স্বর্ণদ্বীপে’ প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ছয়টি পদাতিক ব্রিগেড দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। ২৯ মার্চ ২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত গত চার বছরে ২৮ হাজার ৯৬৭ জন সেনাসদস্য এখানে প্রশিক্ষণ সুবিধা পেয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণেও স্বর্ণদ্বীপ ব্যবহূত হচ্ছে।  

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পরিকল্পিত অর্থায়ন ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বদলে যেতে পারে সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বীপ। দ্বীপটির চারপাশে উঁচু বাঁধ দিয়ে এবং নিবিড় বনায়নের মাধ্যমে বৃক্ষবলয় সৃষ্টি করে সারা বছর এটি ব্যবহারোপযোগী করে তোলা যায়। এর ফলে এটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পাবে। সারা বছর ধরে এই দ্বীপে প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা যাবে। ফলে নতুন আয়বর্ধক প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে স্বর্ণদ্বীপ প্রকৃত অর্থেই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এর একাংশ ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক মানের একটি মিলিটারি ট্রেনিং একাডেমিও গড়ে তোলা যেতে পারে।  

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow