Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৬ এপ্রিল, ২০১৮ ২১:৩৫
অদম্য সাহসী ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট নিরজা ভানোট
নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়েছেন ৩৬০ যাত্রীর প্রাণ
সাইফ ইমন
নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়েছেন ৩৬০ যাত্রীর প্রাণ

ছিনতাই হওয়া বিমান থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৩ বছর বয়সী নিরজা ভানোট। নিজের চব্বিশতম জন্মদিনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে। সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে ভারত সরকার নিরজাকে ‘অশোক চক্র’ পুরস্কারে ভূষিত করে, আমেরিকার সরকার তার জন্য ঘোষণা করে ফ্লাইট সেইফটি ফাউন্ডেশন ‘হিরোইজম অ্যাওয়ার্ড’। পুরস্কারের ঘোষণা আসে পাকিস্তান ও কলম্বিয়া সরকারের পক্ষ থেকেও। ২০০৪ সালে অসম সাহসী এই ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের নামে একটি স্ট্যাম্পও বের করে ভারত সরকার

 

৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬। এদিন প্যান অ্যামের বিমান ফ্লাইট-৭৩ করাচিতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বিমানটি সাইপ্রাসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর সেখানে যাত্রীদের জিম্মি করে নিজেদের দলীয় কিছু সন্ত্রাসীকে জেল থেকে মুক্ত করাবে। কিন্তু নিরজা ভানোট সেই পরিকল্পনা সফল হতে দেননি। মূলত তার চেষ্টায়ই বিমান নিয়ে উড়ে যেতে পারেনি ছিনতাইকারীরা। শুধু তাই নয়, বিমানের আমেরিকান যাত্রীরাই মূল লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসীদের। কিন্তু নিরজা তাদের পাসপোর্ট লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেন। আর বিমান ছিনতাই যতটা সহজ হবে বলে ভেবেছিল সন্ত্রাসীরা, ততটা সহজ হয়নি। যাত্রীদের বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখে চারজন সশস্ত্র ছিনতাইকারীর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েন নিরজা। নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়ে দেন ৩৬০ জনের প্রাণ।

 

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

১৯৬৩ সালে ভারতের চণ্ডীগড়ে জন্ম নিরজা ভানোটের। সেখান থেকেই মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে আসেন তিনি। মুম্বাইয়ের সেইন্ট জেভিয়ার্স থেকেই গ্র্যাজুয়েশন করেন। 

 

বিয়ে ও কর্মজীবন

১৯৮৫ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে মা-বাবার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে করে মধ্যপ্রাচ্যে চলে যান নিরজা। কিন্তু বিয়ের পর থেকে ক্রমাগত পণের জন্য চাপ দেওয়ায় এক সময় স্বামীকে ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন নিরজা। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ‘প্যান অ্যাম’ সংস্থায় এয়ার হোস্টেস বা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হওয়ার জন্য আবেদন করেন। কাজটি পেয়েও যান তিনি। 

 

বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা

১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মুম্বাই থেকে করাচি হয়ে নিউইয়র্কের পথে যাত্রা করা প্যান অ্যাম সেভেনটি থ্রি বিমানটি জিম্মি করে সন্ত্রাসীরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি সাইপ্রাসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর সেখানে যাত্রীদের জিম্মি করে নিজেদের দলীয় কিছু সন্ত্রাসীকে জেল থেকে মুক্ত করবে। নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে চার জঙ্গি করাচি থেকে বিমানে ওঠে। নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমান উড়িয়ে নেওয়ার জন্য প্রায় ১৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করে সন্ত্রাসীরা। এরপরই শুরু করে গুলি। এ সময় তিন শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যান নিরজা। তবে মারা যাওয়ার আগে ৩৬০ যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে যান তিনি। মৃত্যুর দুই দিন পরই ছিল তার ২৩তম জন্মদিন। হাইজ্যাকের ঘটনায় ৩৮০ যাত্রীর মধ্যে নিরজাসহ নিহত হয়েছিলেন মোট ২০ জন। বাকি যাত্রীদের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছিলেন নিরজা, যিনি খুলে দিয়েছিলেন বিমানের জরুরি নির্গমনের পথটি। এর ফলে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালানো শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত যাত্রীরাই হামলে পড়ে এই চার জঙ্গির ওপর। তার আগেই নিরজাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে তার মাথায় গুলি করে জঙ্গিদের প্রধান। এই ভয়ঙ্কর সময়ের পুরোটা জুড়েই নিরজা শান্ত আর কর্মক্ষম ছিলেন। তিনিই সবার আগে হাইজ্যাকের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন বিমানচালক এবং নির্বাহী কর্মকর্তাদের। এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী সবাই ককপিট থেকে বেরিয়ে যান যেন বিমানটি উড়তে না পারে।

 

সম্মাননা

সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে ভারত সরকার নিরজাকে ‘অশোক চক্র’ পুরস্কারে ভূষিত করে, আমেরিকার সরকার তার জন্য ঘোষণা করে ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশন ‘হিরোইজম অ্যাওয়ার্ড’। পুরস্কারের ঘোষণা আসে পাকিস্তান ও কলম্বিয়া সরকারের পক্ষ থেকেও। ২০০৪ সালে অসম সাহসী এই ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের নামে একটি স্ট্যাম্পও বের করে ভারত সরকার।

 

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

ওই অভিশপ্ত বিমানে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী, ডক্টর কিশোর মূর্তি। তিনি জানিয়েছেন, করাচি বিমানবন্দরে ৩৬১ জন যাত্রী ও ১৯ বিমানকর্মীসহ ওই বিমানটিকে হাইজ্যাক করে চার সশস্ত্র জঙ্গি। বিমানসেবিকা হিসেবে নিজের প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ পেয়েও বিমান  ছেড়ে পালিয়ে যাননি নিরজা। নিজের থেকে যাত্রীদের নিরাপত্তাকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ঘটনার সময় ভারতীয় ও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি তিনি। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সব বিমানযাত্রীকে বিমান থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু দুটি বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়েই জঙ্গিদের চোখে পড়ে যান নিরজা। ছয় নম্বর রো থেকে নিরজার মৃত্যুর সেই ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছিলেন ডক্টর মূর্তি। তার চোখের সামনে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক দূরত্ব  থেকে নিরজাকে খুন করে জঙ্গিরা।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow