Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৫ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ মে, ২০১৮ ২১:৩৪
আকাশ থেকে বাংলাদেশের বস্তিতে এমিরেটসের মারিয়া
চন্দ্রনী চন্দ্রা
আকাশ থেকে বাংলাদেশের বস্তিতে এমিরেটসের মারিয়া

২০০৩ সাল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস এয়ারলাইনসের নিয়ম অনুযায়ী যাত্রাবিরতি। এই বিরতির সময় এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে পাশেই এক বস্তিতে ঢুকে পড়েন মারিয়া কনসেইসাও। সেখানে থাকা শিশুদের মজার সব খেলা আর প্রাণোচ্ছলতা এমন নোংরা বস্তির মাঝেও এতটুকু মলিন হয়নি। কিন্তু এমন পরিবেশে থাকা এই নিষ্পাপ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন মারিয়া। আর তখনই সিদ্ধান্ত নেন, ওদের জন্য কিছু করার। শুরু করেন নিজের বেতনের অংশ দিয়ে শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম। এরপর কনসেইসাও ২০০৫ সালে মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।

 

মারিয়া কনসেইসাও; জন্ম পর্তুগালের লিসবনের সিন্ট্রা শহরে। বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারান। মা মারা যাওয়ার পর মারিয়া বড় হন আফ্রিকান অভিবাসী এক পালিতে মায়ের কাছে। সেই পালিত মা-ও বেশি দিন বাঁচেননি। জীবনযুদ্ধে নানা চড়াই-উতরাই পার করা এই নারী পরে যোগ দেন এমিরেটস এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রুতে। বর্তমানে তিনি থাকছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

 

মারিয়া কনসেইসাও শুরুতে ঢাকার বস্তির অসহায় শিশুদের জন্য কাজ করতে গিয়ে অর্থ সংকটে পড়েন। আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ঢাকা প্রজেক্ট’ নামে কাজ শুরু করেন তিনি। ওই প্রজেক্টের আওতায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি স্কুল, ক্লিনিক, দোকান ও ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। পথশিশুদের জন্য অর্থের জোগান দিতে নিজের চাকরির ফাঁকে ফাঁকে মারিয়া বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আসছেন। এরপরও ভবিষ্যতের আরও অর্থ সংগ্রহের জন্য বেছে নেন অভিনব সব পথ। ২০১১ সালে টানা সাত দিন ম্যারাথনে যোগ দিয়ে ছুটে বেরিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি প্রদেশ। ২০১১ সালে অর্থাৎ একই সালে প্রথম পর্তুগিজ নারী হিসেবে ছুঁয়েছেন এভারেস্টের চূড়া। এরপর থেকে বেশকটি মহাদেশে আয়োজিত ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন মারিয়া। একটি দুটি নয়, গড়েছেন ছয়টি গিনেস বিশ্বরেকর্ড। শুধু বিশ্বরেকর্ডই নয়, মারিয়া তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন বিশ্বজুড়ে নানা পুরস্কার। পেয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার, ২০০৯ সালের এমিরেটস হিউমেনিটেরিয়ান ওমেন অব দ্য ইয়ার, এমিরেটস ওমেন অব দ্য ইয়ার, মোস্ট ইনসপায়ারিং ওমেনর অব জিসিসি ২০১০, ২০১৩ সালে সাসটেইনেবল লিডারশিপ, ২০১৪ সালে ইনসপায়ারিং  চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ডসহ আরও নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মারিয়া কনসেইসাও। এ ছাড়া জিকিউ পর্তুগালের পুরুষদের সবচেয়ে বড় ফ্যাশন, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা-বিষয়ক একটি ম্যাগাজিন। ম্যাগাজিনটি সাধারণত ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড দিয়ে থাকে। কিন্তু সে সময় মানবপ্রেমী নারীকে পুরস্কার দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ম্যাগাজিনটি এক বিবৃতিতে জানায়, জিকিউ পর্তুগাল মারিয়ার সাফল্য দেখে এতই মুগ্ধ যে ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য তারা ম্যান অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পুরুষের পরিবর্তে একজন নারীকে দিয়েছে। ঢাকা প্রজেক্ট হিসেব কাজ শুরুর কিছুদিন পর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশন। নিজের মায়ের নামে এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন মারিয়া কনসেইসাও। বর্তমানে এই ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ৬০০ ছাত্রছাত্রী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লেখাপড়া করছে। যাদের মধ্যে বিলকিস ও তাসলিম পড়ছে দুবাই ইউনিভার্সিটিতে। শিউলির লেখাপড়াও দুবাইতে।

 

সম্প্রতি দুবাইয়ে মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশনের অধীনে ইয়ুথ ফোরামের আয়োজনে এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণও করেছিল শিউলি। এ ছাড়া মিলন অস্ট্রেলিয়ায় আর সুজন পড়ছে বর্তমানে আমেরিকায়। মারিয়ার হাত ধরে নিজেদের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনও বদলে যাওয়ার কথা জানায় শিউলি নিজেই। মারিয়ার প্রথম দেখা সেই বস্তির মানুষগুলো এখন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারে। এই পর্তুগিজ নারীর কল্যাণে আলো ফিরেছে অনেক পরিবারে। তাদের ছেলেমেয়ে এখন ক্যামব্রিয়াম স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। ঢাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করতে নেমে নিজের পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধবদের যেমন সাড়া পান মারিয়া, তেমনি তার স্বপ্নও বড় হচ্ছে দিন দিন। শতাধিক পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া মারিয়া স্বপ্ন দেখেন এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাই একদিন দেশসেরাদের তালিকায় নাম লেখাবে। 

 

মারিয়া তার কাজের কথা, তার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে জানান, সাত মহাদেশে আল্ট্রা ম্যারাথন শেষ করা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় আমাদের শিশুদের প্রতিদিন যে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়, তার তুলনায় আমার চ্যালেঞ্জ কিছুই না। আমি পর্তুগালের  মেয়ে হলেও আমার সব অর্জনে পর্তুগালের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও তুলে ধরেছি। যে কোনো প্রতিযোগিতায় আমি দুটো পতাকা নিয়ে যাই। একটি পর্তুগালের অন্যটি বাংলাদেশের।

মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম শুধু বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণ হচ্ছে তা নয়, এই ফাউন্ডেশন ও মারিয়াকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করছেন দেশে-বিদেশে তরুণ সংগঠক। মারিয়ার দেখাদেখি তারা কাজ করছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে।

 

মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিন ধরে বাস করছেন বাংলাদেশে। পর্তুগিজ হলেও এই নারী হৃদয়ে ধারণ করেন বাংলাদেশকে। চাকরির সুবাদে মারিয়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসে পথশিশুদের অবস্থা দেখে তিনি তাদের সাহায্য করতে মনস্থির করেন। এরপরই পরিবার সহকর্মীদের সহায়তায় দরিদ্র পরিবারকে সাহায্যের জন্য একটি দাতব্য প্রকল্প শুরু করেন। এক কক্ষের একটি স্কুল দিয়ে মারিয়ার ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়। দারিদ্যের চক্র ভাঙার জন্য মারিয়া মানবিক প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। এই ফাউন্ডেশনে অন্তত ৩৫ জন বাংলাদেশি আরব আমিরাত ও ওমানে কাজ করছেন। বর্তমানে মারিয়া খুব  চেষ্টা করছেন ঢাকার স্কুলের জন্য আরও তহবিল জোগাড় করার। যাতে স্কুলের নির্ধারিত পোশাক-পরিচ্ছদ, তাদের খাওয়া-দাওয়া এবং স্কুুল থেকে আনা-নেওয়া পরিবহনের ব্যবস্থা করা যায়। এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন বদলে দিতে ছোট উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বদলে দিতে পারে অনেকের জীবন, এমনই এক উদাহরণ হয়ে থাকবে মারিয়ার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান মারিয়া ক্রিস্টিনা ফাউন্ডেশন।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow