Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৫ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ মে, ২০১৮ ২১:৩৮
অ্যান্টি সোয়েট
হাত-পা ঘামার সমাধানে বাংলাদেশি প্রযুক্তি
হাত-পা ঘামার সমাধানে বাংলাদেশি প্রযুক্তি

“  ১৯৯২ সালের দিকে দেশের একজন বিশিষ্ট চর্ম চিকিৎসক ড. রেজা বিন জায়েদ আমাকে অনুরোধ করেন দেশে আয়ন্টোফোরেসিস যন্ত্র তৈরি করার জন্য। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে এ যন্ত্রের কার্যকারণ সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ধারণায় একটি যন্ত্র তৈরি করি।

— ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী

 

অতিরিক্ত হাত-পা ঘামা একটি বিব্রতকর এবং অস্বস্তিকর শারীরিক সমস্যা। হাত বা পায়ের তালু ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশেও অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। মৃদু থেকে শুরু করে ফোঁটা-ফোঁটা পানির মতো ঘাম পড়তে পারে এ সমস্যায়। বিভিন্ন কারণে অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে যার কারণ পুরোপুরি জানা নেই বিজ্ঞানীদের। তাই সমস্যাটির বৈজ্ঞানিক নাম Idiopathic Hyperhidrosis.. অতিরিক্ত ঘামের একটি সফল চিকিৎসা হলো আয়ন্টোফোরেসিস যন্ত্র ব্যবহারে হাত বা পায়ের তালুর ভিতর দিয়ে মৃদু একটি বিদ্যুৎ প্রবাহ পরিচালিত করা। ত্রিশ দশকে প্রথম হাত-পা ঘাম নিরসনের জন্য আয়ন্টোফোরেসিসের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয় ও ধীরে ধীরে এ পদ্ধতির উন্নতি হয়। এ পদ্ধতির সুবিধা হলো যে এর কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই এবং রোগী ঘরে বসেই এ চিকিৎসা নিতে পারেন। তাই কিছুদিন পরপর কয়েক দিন করে এ চিকিৎসা নিয়ে রোগী সব সময়ের জন্যই ভালো থাকতে পারবেন। বলা বাহুল্য, এ রোগের কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।

১৯৯২ সালের দিকে দেশের একজন বিশিষ্ট চর্ম চিকিৎসক ড. রেজা বিন জায়েদ আমাকে অনুরোধ করেন দেশে আয়ন্টোফোরেসিস যন্ত্র তৈরি করার জন্য। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে এ যন্ত্রের কার্যকারণ সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ধারণায় একটি যন্ত্র তৈরি করি। এ যন্ত্রটি নিয়ে ড. জায়েদ তৎকালীন পিজি হাসপাতাল (বর্তমানের বিএসএমএমইউ) এবং বারডেমে দুই বছর ধরে রোগীদের ওপর পরীক্ষা করে ভালো ফলাফল পান। এ সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ থেকে একটি কেন্দ্র থেকে এ চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু করি। কেউ চাইলে যন্ত্র তৈরি করে দেওয়ারও ব্যবস্থা করি। ঘাম প্রতিরোধ করে, তাই আমরা যন্ত্রটির নাম দিই  Anti-Sweat.

 

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। অনেকেই এসে শুধু দেখে যাচ্ছেন, কিন্তু কেউই চিকিৎসা নেওয়া বা যন্ত্র নেওয়াতে উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। কারণ, চিকিৎসা পদ্ধতিটি মোটামুটি অপরিচিত, এমনকি অনেক ডাক্তারের কাছেও। তখন দুই মাসের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিই। কিছুদিনে ২২ জন রোগী চিকিৎসা নেন এবং সবাই ভালো হন। পরবর্তীতে তারা সবাই যন্ত্র কিনে নিয়ে যান। এভাবেই অল্প অল্প করে এ যন্ত্রের ব্যবহার চলতে থাকে দেশে।

২০০৮ সালে আমার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে এ বিভাগের গবেষণার আওতায় যন্ত্রটিকে এনে আরও উন্নত করা হয় এবং মাঝে মাঝে ঘোষিত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিনামূল্যে জনগণকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে এ বিভাগের উদ্ভাবন করা বা উন্নয়ন করা কোনো যন্ত্রপাতিরই পেটেন্ট না করার একটি দর্শন আমাদের রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে আমার নেতৃত্বে জনকল্যাণমূলক অংশীদারবিহীন কোম্পানি ‘বাইবিট লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে এ কোম্পানির মাধ্যমে সুলভে অ্যান্টি সোয়েট যন্ত্রটি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে .িনরনবধঃ.পড়স ওয়েবসাইটে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কয়েক হাজার মানুষ অ্যান্টি-সোয়েট যন্ত্র ব্যবহার করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। ‘ভাই, ৩০ বছরের জীবনে এই প্রথম একটি কাগজ হাতে নিয়ে চলতে পারছি’— এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আমরা পেয়েছি সুফল পাওয়া মানুষের কাছ থেকে। অনেক রোগী আসত, হাত-পা থেকে টপ টপ করে ঘাম পড়ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যান্ডেলের আশপাশে কাদা কাদা হয়ে যাচ্ছে। তারাও ভালো হয়ে ধন্যবাদ জানাতে এসেছেন— কী যে ভালো লেগেছে।

অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হাতের ঘাম স্বাভাবিক হলে পায়ের ঘাম এমনিতেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমাদের ব্যবস্থায় এক হাতে ২০ মিনিট করে দুই হাতে ৪০ মিনিট করে দৈনিক চিকিৎসা নিতে হয়। প্রাথমিক চিকিৎসায় এরকমভাবে ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীর ঘাম স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরপর ৫-৬ সপ্তাহ পর আবার ঘাম শুরু হলেই দু-তিন দিন একই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এমনি করে নিয়মিত ৫-৬ সপ্তাহ পর পর কয়েক দিন করে চিকিৎসা নিলে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে এ চিকিৎসার কার্যকরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো পরিষ্কার নন। তবে ধারণা করা হয়, বিদ্যুতের সাহায্যে বিশেষ কিছু আয়ন ত্বকের ভিতর দিয়ে চলাচল করার সময় ঘর্মগ্রন্থির মুখে হাইপারকেরাটোটিক প্লাগ তৈরি হয় যা মস্তিষ্ককে সংকেত পাঠায় আর ঘাম তৈরি না করার জন্য। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কাজ করে না। পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে দেখা যায় যে তাদের পদ্ধতিতে প্রায় ৮৫% রোগীর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কাজ করে। তবে বাংলাদেশের পদ্ধতিতে আমরা এর থেকে অনেক ভালো ফলাফল পেয়েছি, কয়েক হাজার রোগীর প্রায় ৯৮% ই সুফল পেয়েছেন।

আমাদের তৈরি যন্ত্রে প্রথমে এক হাতে ও পরে অন্য হাতে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছি এ জন্য যে রোগী নিজেই অপর হাত দিয়ে বৈদ্যুতিক কারেন্টের নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারেন। আবার সে হাতে একটি বই নিয়ে পড়ে সময়টি কাজে লাগাতে পারবেন। বিদেশি কিছু যন্ত্রে দুই হাতে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে সময় কম লাগে কিন্তু মাঝপথে কখনো বৈদ্যুতিক কারেন্ট অসহনীয় হয়ে গেলে অপর একজনের সহায়তা ছাড়া রোগী নিজে কমাতে পারেন না, কারণ হাত উঠিয়ে ফেললে একটু বৈদ্যুতিক শক পাওয়া যায়। অবশ্য এ শক ক্ষতিকর কিছু নয় তবে অস্বস্তিকর। আবার এ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক কারেন্ট শরীরের হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে যায়, তাই পেসমেকার থাকা রোগীদের জন্য বিদেশের সে যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না। অপরদিকে আমাদের ব্যবস্থায় এক হাতের তালুর এক অর্ধেক থেকে অপর অর্ধেকে বৈদ্যুতিক কারেন্ট চলে, ফলে হাতের বাইরে কারেন্ট যায় না। এর জন্য আমাদের যন্ত্রটি পেসমেকার থাকা রোগীর জন্যও নিরাপদ। তার ওপর আমাদের যন্ত্রে ডিসি কনস্ট্যান্ট কারেন্ট ব্যবহার করা হয়, যার জন্য এটি আরও নিরাপদ। পাশ্চাত্যের অনেক যন্ত্রে পালসেটিং ডিসি কারেন্ট ব্যবহার করা হয়, যেটি হৃৎপিণ্ডের জন্য নিরাপদ নয়। আয়োন্টোফোরেসিস ছাড়া অতিরিক্ত ঘামের যে চিকিৎসাগুলো পৃথিবীতে চালু আছে তার একটি হচ্ছে মেরুদণ্ডের কাছে অপারেশন করে কিছু স্নায়ু কেটে ফেলা। এটি একটি জটিল অপারেশন এবং কখনো অন্যান্য স্নায়ু কেটে গিয়ে শরীরের কোথাও কোথাও অনুভূতি লোপ পেতে পারে, যা আর সারা জীবনেও ঠিক করা যায় না। আবার হাতের ঘাম বন্ধ হলেও অনেক সময় শরীরের অন্য স্থানে ঘাম বেড়ে যেতে দেখা যায়। অপর চিকিৎসা হচ্ছে বোটক্স ইনজেকশন যা ৬ থেকে ৯ মাস পরপর নিতে হয়। এ ইনজেকশন অনেক ব্যয়বহুল। তা ছাড়া ইনজেকশনটি একটি মারাত্মক বিষ থেকে তৈরি। সারা জীবন এ ইনজেকশন নিলে তার দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি হবে কিনা তা বলা মুশকিল। সব বিশ্লেষণ করে আমাদের ধারণা, আয়ন্টোফোরেসিসই হতে পারে অতিরিক্ত হাত-পা ঘামের সবচেয়ে ভালো সমাধান। দেশের সাধারণ মানুষের অর্থে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শাখায় উচ্চশিক্ষিত হয়েছি। তার বিনিময়ে অল্প হলেও মানুষের জন্য কিছু করতে পেরেছি এটি আমাদের বড় পাওয়া।

 

ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী

অনারারি প্রফেসর, বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড

টেকনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow