Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ২ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১ জুন, ২০১৮ ২১:৪৮
আফ্রিকায় খাবার জোগায় বাংলাদেশ
শিমুল মাহমুদ
আফ্রিকায় খাবার জোগায় বাংলাদেশ

সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের প্রায় অর্ধ কোটি মানুষের খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আসে ৬১০ কিলোমিটার দীর্ঘ একমাত্র সড়কপথ হয়ে ক্যামেরুন থেকে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এই দীর্ঘ পথ পাহারা দিয়ে পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন রাজধানী বাঙ্গিতে। নইলে অভুক্তই থাকতে হতো অসংখ্য মানুষকে। অন্যদিকে মালিতে প্রায় ১৩ হাজার বহুজাতিক শান্তিরক্ষীর নিত্যদিনের খাবার, অস্ত্র ও সব সরঞ্জাম আনতে হয় ১২০০ থেকে ১৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। ৩০-৪০ দিন রাস্তায় কাটিয়ে। জীবন ঝুঁকির এই যাত্রায়ও বাংলাদেশই একমাত্র ভরসা। বিস্তারিত ভিতরের পাতায় লিখেছেন— শিমুল মাহমুদ

 

একেই বলে এক যাত্রায় অনেক ফল। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও মালিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কার্যক্রম দেখতে গিয়ে সঙ্গে আরও অনেক দেশই দেখা হয়ে গেল। কাতারের দোহা ও মরোক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় দীর্ঘ যাত্রাবিরতি শেষে ক্যামেরুন ছুঁয়ে ৪০ ঘণ্টা পর যখন রাজধানী বাঙ্গিতে নামলাম, ক্লান্তি তখন শরীর জেঁকে বসেছে। তখন স্থানীয় সময় ১৪ মে বিকাল। আমাদের গন্তব্য প্রায় সাড়ে ৫শ কিলোমিটার দূরের বোয়াক প্রদেশ। সড়ক পথে। দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার ছুটতে হলো। কারণ, সন্ধ্যার আগেই আমাদের রাত্রিবাসের নির্ধারিত বোসামতেলে ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। বাঙ্গি টু ক্যামেরুন ৬১০ কিলোমিটার দেশের একমাত্র সড়ক ধরে এগোচ্ছি আমরা। আমাদের ৫ সদস্যের মিডিয়া টিমের দলনেতা সেনা সদরের লে. কর্নেল আজহারুল ইসলাম। মিশনের শুরুতে ২০১৪ সালেই তিনি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বললেন, দীর্ঘ এই রাস্তাটির নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের। এদেশের কোনো সমুদ্র বন্দর নেই। ক্যামেরুন থেকে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আসে কঠোর পাহারার মধ্য দিয়ে। এ জন্য জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেকে পৃথক চাহিদা জানিয়ে স্পেশাল ফোর্স আনিয়েছে। সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে প্যারাকমান্ডো ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে এই স্পেশাল ফোর্সের যাত্রা শুরু। বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা এদেশের জন্য ক্যামেরুন থেকে আসা খাদ্য পণ্য সামগ্রী পাহারা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। স্পেশাল ফোর্স ছাড়া কোনো কনভয় মুভ হয় না। কঠোর নিরাপত্তা ছাড়া কোনো গাড়ি এই দীর্ঘ রাস্তায় চলতে পারে না। জাতিসংঘ দুটি স্পেশাল ফোর্স চেয়েছিল বাংলাদেশের কাছে। বাংলাদেশ পাঠিয়েছে একটি  স্পেশাল ফোর্স। গুরু দায়িত্ব এখন তাদেরই কাঁধে। দেশটির বিবদমান গ্রুপগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা এত বেশি যে, পাহারা না থাকলে মুহূর্তেই পণ্যবাহী কনভয় লুট হয়ে যেতে পারে। না খেয়ে থাকতে হবে অসংখ্য মানুষকে।

অন্যদিকে মালিতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বহুজাতিক বাহিনীর প্রায় ১৩ হাজার শান্তিরক্ষী (মিলিটারি স্টাফ অফিসারসহ) দায়িত্ব পালন করছে। এখানেও জীবনঝুঁকির আশঙ্কা নিয়ে কাজ করছেন শান্তিরক্ষীরা। বাংলাদেশের প্রায় ৯ গুণ বড় দেশটির উত্তরের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সাহারা মরুভূমি। তাপমাত্রা থাকে ৪৬ থেকে ৫০ ডিগ্রির মধ্যে। থাকার জায়গা, গাড়ি সর্বত্রই এসি। বাইরে বেরুলে আগুনের হলকা যেন শরীরে লাগে। সেখানেই সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা খুব বেশি। জাতিসংঘ সরকারের সহায়তায় দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার তৎপরতায় নিয়োজিত। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি শান্তিরক্ষীরাও সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু। গত ৪ বছরে সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৪৫ জন শান্তিরক্ষী জীবন দিয়েছেন। বাংলাদেশ হারিয়েছে ১৯ জন শান্তিরক্ষীকে। বৈরী আবহাওয়া, বিরু সামাজিক পরিবেশকে সামনে রেখেই কাজ করছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। মালির রাজধানী বামাকোতে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ ট্রান্সপোর্ট (ব্যান ট্রান্সপোর্ট) কোম্পানি। তাদের অন্যতম দায়িত্ব প্রায় ১৩ হাজার শান্তিরক্ষীর নিত্যদিনের খাবার, অস্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম বিভিন্ন ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া। ক্যাম্পগুলোর দূরুত্ব ৮শ, ১২শ, ১৮শ কিলোমিটার পর্যন্ত। রাতের বেলা কনভয় মুভ হয় না। ফলে, দিনে দিনে সারতে হয় যাত্রা। সেই হিসাবে যেখানে একটি গন্তব্যে ৮-১০ দিন সময় লাগার কথা, সেখানে ৩০-৪০ দিনও রাস্তায় কাটাতে হয় ব্যান ট্রান্সপোর্টের সদস্যদের। কখনো খোলা আকাশের নিচে ধু-ধু মরুভূমিতে রাত কাটাতে হয় শান্তিরক্ষীদের। কনভয়ের সঙ্গে থাকে এক দেড় মাসের খাবার উপকরণ। রান্না করতে হয় পথেই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয় রাস্তাতেই। সে জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার, নার্সসহ একটি মেডিকেল ভ্যানও থাকে গাড়ি বহরে। সশস্ত্র এই কনভয় সারা দেশ ঘুরে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেয়। এটাকে বলা হয় ‘মেইন সাপ্লাই রুট’ বা এমএসআর। সশস্ত্র এই কনভয় যাত্রায় পুরুষদের পাশাপাশি নারী শান্তিরক্ষীরাও অংশ নেন।  

দীর্ঘ যাত্রায় সন্ত্রাসীদের হামলার ভয় থাকে। থাকে চলতি পথে আইইডি (ইমপ্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিস্ফোরণের আতঙ্ক। কিন্তু এসব প্রতীক লতাকে উপেক্ষা করে সামনে এগোতে থাকে পণ্যবাহী গাড়ির বহর। যাত্রার আগে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করা হয়, যেন পুরো যাত্রাটা নির্বিঘ্ন হয়। সবাই যেন অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন ক্যাম্পে।

 

মালিতে নিয়োজিত এক শান্তিরক্ষী বলেন, আমরা যখন কনভয় নিয়ে মুভ করি তখন জীবনের কোনো মায়া থেকে না। নিরাপত্তার কারণে রাতে চলাচল বন্ধ থাকে। তখন খোলা মাঠেও আমাদের তাঁবু টাঙিয়ে থাকতে হয়। সেখানেই রান্না, খাওয়াসহ পরবর্তী ভোরের অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় ডাক্তার, নার্স, কুক পর্যন্ত কনভয়ের সঙ্গে থাকে।

মালির রাজধানী বামাকোতে নিয়োজিত বাংলাদেশ ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সদস্যদের মূল কাজ হচ্ছে বামাকো থেকে কিদাল কিংবা দূরবর্তী স্থানে মোতায়েন শান্তিরক্ষীদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া। এ কাজটি তারা নানা প্রতীক লতা সত্ত্বেও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছে। মরুভূমির দুর্গম পথ দিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তারা রসদ সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে কিদালে। পথিমধ্যে রয়েছে বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা, রয়েছে মাইন আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে মরুঝড় ও বালুঝড় প্রায়ই আঘাত হানে গাড়ি বহরকে। এ সময় গাড়িগুলো থামিয়ে ২-৩ দিন পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে গাড়ির চাকা বসে যায়।

কিদালে রসদ সরবরাহ করা হয় বামাকো থেকে সড়কপথে। তবে এ পথকে সড়ক বলা যায় না। সড়কের অধিকাংশ জায়গাই রয়েছে মাইন বিস্ফোরণের ভয় ও বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা। বিদ্রোহীরা রাস্তায় চৌম্বক মাইন পুঁতে রাখে। চলন্তু গাড়িতে মাইন নিক্ষেপ করে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। তাছাড়া রয়েছে ধূলিঝড় ও অত্যধিক তাপমাত্রা। রসদ পরিবহনে অনেক সময় লাগার কারণে মাছ, মাংস শাকসবজি ইত্যাদি ৩০%-৪০% নষ্ট হয়ে যায়।

মালিতে বর্তমানে ১১ হাজার ৩৩৮ জন ট্রুপস ও মিলিটারি স্টাফ মিলিয়ে ১৩ হাজার ১৬৮ জন শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছে। এসব শান্তিরক্ষীর নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে পৌঁছে দিতেই গত চার বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ট্রান্সপোর্ট কোাম্পানি।

ব্যানট্রান্সপোর্টের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার  লে. কর্নেল এফতেখার উদ্দিন বলেন, গত এক বছর ধরে আমরা ১৯টি কনভয় মুভ পরিচালনা করেছি এবং কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই কাজ শেষ করেছি। ২০১৪ সালে মালির বামাকোতে বাংলাদেশ ট্রান্সপোর্ট কন্টিনজেন্ট চালু করে। ইউএন আমাদের সরকারের কাছে প্রাথমিকভাবে দুটি ট্রান্সপোর্ট কন্টিনজেন্ট চালুর অনুরোধ করেছিল।

কিন্তু আমরা একটা দিতে পেরেছি। তিনি বলেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত চার বছর মালিতে আমরা একক ট্রান্সপোর্ট কন্টিনজেন্ট হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। চলতি বছর থেকে মিসর ও শ্রীলঙ্কা থেকে ট্রান্সপোর্ট কন্টিনজেন্ট দিয়েছে। তবে পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করার ধারাবাহিকতায় অন্যদের তুলনায় আমাদেরটা অনেক ভালো। সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের মতোই মালিতেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। নেই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের পরিবেশ। পরিস্থিতি এখানে কতটা ভয়ঙ্কর একটি পরিসংখানই সাক্ষ্য দেয়। জানুয়ারি ২০১৬ সাল থেকে গত ২ মে পর্যন্ত মালিতে মোট ৮৯টি হামলা ও নাশকতার ঘটনায় ১১৯ জন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনায় এটিকে বিশ্বের এক নম্বর বিপজ্জনক শান্তিরক্ষা মিশনের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে মালিতে আইইডি (ইমপ্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিস্ফোরণে চার বাংলাদেশি প্রাণ হারান। এরপর থেকেই  শান্তিরক্ষীদের নিজেদের নিরাপত্তার দিকেই জোর দিতে হচ্ছে বেশি। সংগ্রহ করতে হচ্ছে অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও যোগাযোগ উপকরণ। উল্লেখ্য, মালির সরকারি বাহিনী, বড় সুবিধাভোগী ফ্রান্সের বারখান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সশস্ত্র গ্রুপ জি-৫ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর ক্রমাগত তৎপরতা সত্ত্বেও মালির উত্তরাঞ্চলে সংঘাত বন্ধ করা যাচ্ছে না। শান্তিরক্ষীরা তাদের অন্যতম টার্গেট হলেও বাদ যাচ্ছে না সাধারণ মানুষসহ কোনো পক্ষই। এমন কোনো সপ্তাহ নেই যে, এইভাবে লোকজন নিহত হচ্ছে না। তিম্বকতু রিজিয়নাল ইউএন বেইজ গত বছরের শেষে এক মাসে চারবার রকেট আক্রমণের শিকার হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরাও অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও যোগাযোগ উপকরণ ব্যবহার করছে। সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে মাইন রেজিস্ট্যান্স আর্মার প্রোটেক্টটেড ভেহিকল (এমর‌্যাভ)। এই গাড়ির নিচে যদি মাইন পড়ে সেটা সে প্রোটেক্ট করবে এবং চতুর্দিকে ১০০ মিটার পর্যন্ত জ্যামার তৈরি করতে পারে। যার মাধ্যমে রিমোট কন্ট্রোলে যদি কেউ মাইন বিস্ফোরণ ঘটাতে চায় তাহলে সেটা ব্যর্থ হবে। এই গাড়ির চাকার বিশেষত্ব হলো, এর চাকা যদি কোনো হামলায় পাংচার হয়ে যায় তাহলেও এটি ২০-৩০ কিলোমিটার অনায়াসে পেরিয়ে যেতে পারবে। উপরে যে সৈন্য থাকে সে না থাকলেও এটি ভিতর থেকে অপারেট করা যায়। এটি একেবারে মডার্ন ভেহিকেল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। বিশ্বের এক নম্বর ঝুঁকিপূর্ণ শান্তিরক্ষা মিশন মালিতে সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনায় এই যানটি ব্যবহূত হচ্ছে। এ ছাড়াও সেন্ট্রাল আফ্রিকা ও মালিতে আমাদের শান্তিরক্ষীরা শত শত যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। যার ভাড়া বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ। কোনো কোনো সরঞ্জামের ভাড়ার আয়ে কেনা দাম উঠে গেছে অনেক আগেই। সেন্ট্রাল আফ্রিকায় বাংলাদেশের কান্ট্রি সিনিয়র কর্নেল খন্দকার আলী রেজা বলেন, আমরা এখন দেশ থেকে অনেক সাপোর্ট পাচ্ছি। সরঞ্জামের দিক থেকে অনেক সহায়তা পাচ্ছি। ভালো ভালো সরঞ্জাম দিয়ে আমাদের সুরক্ষিত করা হচ্ছে। ফলে আমাদের প্রফেশনালিজমটা ডিসপ্লে করতে পারছি।

 

 

জাতিসংঘের বড় বিজ্ঞাপন নাঈমা-তামান্না

শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ৭০ বছর অতিক্রম করছে জাতিসংঘ। ইউএন পিসকিপার্স ওয়েবসাইটে এ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষীদের যে ছবিগুলো রিলিজ করা হয়েছে তার শুরুতেই বাংলাদেশি দুই নারী পাইলটের মুখচ্ছবি। তারা হলেন, বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাঈমা হক এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুিফ। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা করে। এ বছর সেটি ৭০ বছরে পা রাখছে। অন্যদিকে ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ ইরাক মিশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়। এ বছর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রায় ৩০ বছর অতিক্রম করছে বাংলাদেশও। উল্লেখ্য, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ গত ৩০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজেদের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখছে। এ উপলক্ষে সম্প্রতি জাতিসংঘে এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন। গত ২৯ মে ছিল আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাঈমা হক এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুিফর সচিত্র অবস্থান আমাদের নারী শান্তিরক্ষীর অবস্থানকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। তা সত্ত্বেও জাতিসংঘ সদর দফতরে উচ্চ পর্যায়ের নিযুক্তিতেও আমাদের মহিলা শান্তিরক্ষীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। উল্লেখ্য, কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিমানবাহিনীর ১৫ জন নারী কর্মকর্তার মধ্যে দুজন নারী পাইলট হলেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাঈমা হক এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই- লুিফ। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে কঙ্গোতে যান তারা। সেখানে তারা হেলিকপ্টারের চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশ্বশান্তি রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা। এক সময় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মেডিকেল কন্টিনজেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল নারী শান্তিরক্ষীদের কর্মতৎপরতা। বর্তমানে সেটা কমান্ডিং কর্মকাণ্ড, অপারেশনসহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। মালি ও সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ শান্তিরক্ষা মিশনে অদম্য সাহসিকতা নিয়ে কাজ করছেন সেনাবাহিনীর নারী সদস্যরা।

 

অবদান রাখছেন নারীরাও

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নারী সদস্যরা। বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ৮২ জন ও পুলিশের ৭৫ জন সদস্য বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষায় কর্মরত আছেন। সশস্ত্র বাহিনীর ৮২ জন নারী সদস্যের মধ্যে দুইজন নারী পাইলটও রয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বড় জায়গাজুড়ে অবস্থান বাংলাদেশের। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের শান্তি ও সুরক্ষায় তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ৭ হাজার ৭৫ জন শান্তিরক্ষী কাজ করছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ৫ হাজার ৪৫৩ জন, নৌবাহিনীর ৩৪০ জন ও বিমান বাহিনীর ৪৯৯ জন কাজ করছেন। এসব শান্তিরক্ষীর মধ্যে ৮২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৬৫ জন, নৌবাহিনীর ২ জন এবং বিমান বাহিনীর ১৫ জন সদস্য কাজ করছেন। কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিমানবাহিনীর ১৫ জন নারী কর্মকর্তার মধ্যে দুইজন নারী পাইলট রয়েছেন। তারা হলেন— ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুিফ। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে কঙ্গোতে যান তারা। সেখানে তারা হেলিকপ্টারের চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বর্তমানে ৭৫ জন নারী পুলিশ সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত আছেন। মিশনে কনস্টেবল থেকে পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার নারী সদস্যরা রয়েছেন। এ পর্যন্ত মিশন সম্পন্ন করে দেশে ফিরে এসেছেন এক হাজার ১১১ জন নারী পুলিশ।

সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের বোয়াকে দেখা হলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর নূশরাত নূর আল চৌধুরীর সঙ্গে। ছেলেদের মতো ছোট করে কাটা চুল। দেখেই মনে হলো যেন অনেক দিনের চেনা। বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী প্যারাট্রুপার তিনি। দেশের প্রথম প্যারাট্রুপার দম্পত্তি তারা। মেজর নূশরাত বললেন, চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি।

 

সেবা ও ত্যাগে অনন্য সিমিক

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রমের পাশাপাশি সেন্ট্রাল আফ্রিকার একমাত্র খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ক্যামেরুন থেকে বাঙ্গী পর্যন্ত মেইন সাপ্লাই রুট-এমএসআর সক্রিয় ও নির্বিঘ্ন রাখার দায়িত্ব পালন করছে। এসব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড চালাতে হয়। এর মধ্যে সিভিল মিলিটারি কো-অপারেশন-সিমিক অন্যতম। সিমিক কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পারছে। এই লক্ষ্যে তারা স্থানীয় জনগণের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ করছে। তাদের শাকসবজি চাষাবাদ শেখাচ্ছে। বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে। এর মধ্য দিয়ে হতদরিদ্র মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশাল ভূখণ্ডের দেশটিতে মানুষের কষ্টের কোনো শেষ নেই। সেই কষ্ট লাঘবে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। দেশটির মানুষ এইচআইভিসহ নানা রোগে ভুগছে প্রতিনিয়ত। ম্যালেরিয়ায় মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। আছে চর্মরোগসহ নানা অসুস্থতা। এ ছাড়াও নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি করে আহত হয়ে অনেকে আসে হাসপাতালে। এমন একটি জনপদের মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের একটি অস্থায়ী হাসপাতাল। বাংলাদেশ বিভিন্ন ইউনিটে অনেক হাসপাতাল পরিচালনা করে। ব্যানব্যাট-৪ এর নিয়ন্ত্রণে লেভেল-১ হাসপাতালটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেখানে গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, ডেন্টালসহ সব ধরনের রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। রয়েছে আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার। রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং এক্সরের ব্যবস্থাও। নির্ধারিত দিনে লাইন ধরে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন স্থানীয় মানুষ। সেনা সদরের লে. কর্নেল আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের মিডিয়া টিমের সদস্যরাও চিকিৎসা কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ সেন্ট্রাল আফ্রিকার রাজধানী বাঙ্গি থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম বোয়ার এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি স্থানীয় মানুষদের আস্থা ও ভরসাস্থল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। লে. কর্নেল আজহারুল ইসলাম বলেন, আমাদের একেকটা মিশন একেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। এখানে আমাদের শান্তি প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষদের জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যানব্যাট-৪ এর কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল মো. এমদাদ উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখানে জাতিসংঘের আস্থা ও নির্ভরতার জায়গায় রয়েছে। শুরুতে এখানে আমাদের দেশটির মেইন সাপ্লাই রুট-এমএসআর এর একটা অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন অনেকগুণ বাড়িয়ে পুরো ৬১০ কিলোমিটারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও দেশটির অনেক দুর্গম এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আমাদের শান্তিরক্ষীরা। আশা করছি, আমাদের এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশটিতে একদিন শান্তি ফিরে আসবে।

 

জীবন বাঁচায় শেল্টার

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন মালিকে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মিশন। মালির রাজধানী বামাকো থেকে ১২০০ কিলোমিটার দূরের গাওয়ে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের (ব্যানব্যাট-৪) সদস্যরা। সেখানে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষীরা একই বেষ্টনী এলাকায় আলাদা ক্যাম্পে থাকেন। একসঙ্গে এগুলোকে বলা হয়, সুপার ক্যাম্প। এই সুপার ক্যাম্পেও হানা দেয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। শান্তিরক্ষীদের দৃঢ় মনোবলে চির ধরাতে অতর্কিতে হামলা করে বসে। তবে সন্ত্রাসীদের হামলা প্রতিরোধের পাশাপাশি আত্মরক্ষারও নানা কৌশল অবলম্বন করছে শান্তিরক্ষীরা। ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে শেল্টার। প্রায় চার ফুট ব্যাসার্ধের বালির বস্তার বেষ্টনী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে জরুরি মুহূর্তে আশ্রয় নেওয়ার জায়গা। সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়লেই ক্যাম্পের সাইরেন বেজে উঠে। তখন যে যেখানে থাকে সবাই শেল্টারে চলে যায়। যাদের প্রতিরোধ করার দায়িত্ব তারা শেল্টারে থেকেই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোরের সদস্যরা সহায়তা করে। উল্লেখ্য, মালির গাও এবং কিদাল সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের এলাকা। এই দুই এলাকায় শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এজন্য তাদের সতর্ক থাকতে হয় সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে পণ্যবাহী কনভয় মুভের সময় অনেক বেশি নিরাপত্তা সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। মালিতে গত চার বছরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দেড় শতাধিক শান্তিরক্ষীর মূল্যবান প্রাণ গেছে। বাংলাদেশেরও ১৯ জন শান্তিরক্ষীকে আমরা হারিয়েছি এই মালিতে। রাস্তায় পুঁতে রাখা আইইডি (ইমপ্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) চলতি সময়ের বড় আতঙ্ক। এ জন্য সরকার সম্প্রতি মালি মিশনের জন্য মাইন রেজিস্ট্যান্স আর্মার প্রোটেক্টটেড ভেহিকল (এমর‌্যাভ) কিনে দিয়েছে। অত্যাধুনিক এসব যানবাহনের কারণে কার্যক্রম পরিচালনা অনেকটা সহজ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ঝুঁকি অনেকটা কমে গেছে।

 

আফ্রিকার মাচায় বাংলার ফল সবজি

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংঘাতপূর্ণ দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজের ছড়াছড়ি। রাজধানী থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে বোয়ারে বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন ব্যানব্যাট-৪ দেশটির একটি বড় অংশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। নিজেরাও ব্যাটালিয়নের এলাকার মধ্যে শাক-সবজির চাষ করছে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৃষি প্রযুক্তি স্থানান্তর হচ্ছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আবাসস্থল বোসাম্বেলে কোম্পানি অপারেটিং বেস (সিওবি)-এ পৌঁছেই দুপুরের খাবারে বাংলাদেশি সবজির দেখা মিলল। নিজেদের চাষ করা লাউ রান্না করা হয়েছে চিংড়ি দিয়ে। জাতিসংঘের চিংড়ি, বাংলাদেশের লাউ। অপূর্ব সমন্বয়। ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেল, পরম যত্নে লাউ গাছ লাগিয়েছেন সেনা সদস্যরা। সঙ্গে আছে করলা, বেগুনসহ নানা সবজি। বোয়ার এলাকায় ব্যানব্যাট-৪ সদস্যরা অনেক জায়গা নিয়ে সবজি বাগান করেছেন। রাতের খাবারেও মিলল নিজেদের উৎপাদিত সবজির স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ। পাতে এলো সেই লাউ চিংড়ি ও ঢেঁড়স। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের পাশে বিশাল সবজি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, লাউ, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, মুলা, করলা, বেগুন, ঢেঁড়স, পেঁপে, কাঁচামরিচসহ নানা ধরনের সবজির চাষ করা হচ্ছে। একটি প্লটে বিশাল আকারের তরমুজ ও খিরা দেখা গেল। পাশাপাশি লাল শাক, পুঁই শাক, স্কোয়াশ, ধনেপাতা চাষ হচ্ছে।  সেই সবজি খেতে কাজ করছে স্থানীয়রা। স্থানীয় আফ্রিকান ডিজিরে বলেন, ব্যানব্যাট-৪-এ আমি সবজি চাষ করা শিখেছি। বাড়িতেও আমি বাংলাদেশি শাক-সবজি চাষ করেছি। আমার বউ এটা খুব পছন্দ করছে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা জানান, এই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি আমরা যে তাদের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য এখানে এসেছি সেটা তাদের বোঝাতে পারছি।

 

আমের জন্য আকুলতা

রাস্তার দুই পাশে শত শত আম গাছের সারি। সিঁদুর রঙা পাকা আম ঝুলে আছে গাছে। পেকে পড়ে আছে গাছের নিচে কয়েকস্তর হয়ে। কিন্তু কুড়িয়ে নেওয়ার মানুষ নেই, খাবার মানুষ নেই। বাংলাদেশের প্রায় ৬ গুণ বড় সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের মানুষ মাত্র ৪৭ লাখ।

প্রতি মাইলে মাত্র ৭ জন মানুষের বসবাস। কিন্তু বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের এই দেশে তবুও অনাহারে, অর্ধাহারে কাটে মানুষের দিন। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি তাদের নিত্যসঙ্গী। বিমানবন্দর থেকে নেমে গাড়িতে যেতে যেতে চার পাশের হতশ্রী দৃশ্য, বিবর্ণ বাজার, শীর্ণকায় কালো মানুষদের দেখে মনে হলো, আমরা কত ভালো আছি। শিক্ষা ও সভ্যতার আলোহীন মানুষগুলো তাদের ন্যূনতম চাহিদাও মেটাতে পারে না।

অন্যদিকে মালিতেও আমের প্রাচুর্য দেখা গেল। এত চমৎকার বর্ণিল আম দেখলেই খেতে ইচ্ছা করে। রাস্তার পাশে ভাগ দিয়ে আম বিক্রি করে তারা। প্রতি ভাগে ৮/১০টি করে আম। দাম ১০০০ সিফা। আমাদের টাকায় ১৫০ টাকার মতো।   

জাতিগত সহিংসতায় নিমজ্জিত সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিকের মানুষ আম খেতেই জানে না।

ফলে শত শত আম গাছের কোনো দাম নেই সেখানে। আগাছার মতো বেড়ে উঠেছে আমগাছ। স্বাভাবিক কারণেই সেগুলোর কোনো মালিকানাও নেই। গাছ পাকা আম অযত্নে অবহেলায় গাছের নিচে পড়ে পচে যাচ্ছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow