Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ২ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১ জুন, ২০১৮ ২৩:৩২
পাল্টে দেবে বাংলাদেশের চিত্র
বাগেরহাটের ফাতেমা ধান
শখ আহসানুল করিম, বাগেরহাট
বাগেরহাটের ফাতেমা ধান

সব জাতের ধান নয়, এ হচ্ছে অধিক উৎপাদনশীল ফাতেমা ধান। এ ধানের মাহাত্ম্যই আলাদা, তাই তো এ ধানের এত দাম। অধিক উৎপাদনশীল জাতের এই ধান উৎপাদনের চিত্রটাই পাল্টে দেবে। এমনটাই বলছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। অনেকটা গল্পের মতোই সে কাহিনী।

 

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় প্রতি কেজি ধান বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। সব জাতের ধান নয়, এ হচ্ছে অধিক উৎপাদনশীল ফাতেমা ধান। এ ধানের মাহাত্ম্যই আলাদা, তাই তো এ ধানের এত দাম। অনেকটা গল্পের মতোই সে কাহিনী। বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার মাশকাটা গ্রামের ফাতেমা বেগম এ ধান আবিষ্কার করেছেন, তাই এর নাম হয়েছে ফাতেমা জাতের ধান। বাগেরহাটে কৃষকের মুখে মুখে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে এই ফাতেমা ধানের নাম। অধিক উৎপাদনশীল জাতের এই ধান উৎপাদনের চিত্রটাই পাল্টে দেবে। এমনটাই বলছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাই কৃষকরা এখন ছুটছেন ফাতেমা ধানের বীজ সংগ্রহে।

 

যেভাবে আবিষ্কার

ফাতেমা বেগম জানালেন, আমার ছেলে লেবুয়াত ২০১৬ সালে বাড়ির পাশের ধানখেতে হাইব্রিড আফতাব-৫ জাতের ধানের চাষ করে। সেখানে ওই ধানের মধ্যে আমি ব্যতিক্রম ৩টি ধানের ছড়া (শীষ) দেখতে পাই। ওই ছড়াগুলো সংগ্রহ করে আমার ছেলেকে বলি এ ধানগুলো বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। সে প্রথমে অস্বীকৃতি জানালেও মায়ের কথা রেখে পরের বছর জমিতে ওই ৩ ছড়ার ধানের বীজ হিসেবে জমিতে রোপণ করি। ওই বছর তিন ছড়া ধানের বীজে প্রায় আড়াই কেজি উন্নতমানের ধান উৎপাদন হয়। পরে কৃষি বিভাগের লোকেরা খবর পেয়ে আমাদের ধান দেখতে আসেন। আকারে বড় ও ছড়ায় ধানের সংখ্যা বেশি দেখে তারা আমাকে এ ধান সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেন। আমি এ আড়াই কেজি ধানও বীজ হিসেবে পরের বছর নিজের জমিতে বপন করি। এরপর এ বছর ৭৫ শতাংশ জমিতে ওই ধান রোপণ করি। এতে প্রায় ১১০ মণ ধান হয়েছে। এ খবর স্থানীয় কৃষকরা জানার পরে ধান সংগ্রহের জন্য সবাই আমার বাড়িতে আসতে থাকে। আমরা এ ধান বর্তমানে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। তারপরও আমরা চাহিদামতো কৃষকদের ওই ধান দিতে পারছি না। ফাতেমার ছেলে লেবুয়াত বলেন, মায়ের কথা শুনে ধান লাগাই। পরে ধানগুলো বড় হলে একটু আলাদা রকম দেখতে পাই। ধানের পাতাগুলো বেশি চ্যাপ্টা এবং ধানের মোচাগুলো বের হচ্ছিল কলার মোচার মতো। পরে খুশি লাগলে ধানগুলোর একটু বেশি যত্ন শুরু করি। এরপর থেকেই আমাদের এ সফলতা। ফকিরহাটের চাকুলী গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান হাফিজ জানান, এই ধান নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। প্রতিটি ধানের শীষ ১৩-১৫ ইঞ্চি লম্বা, প্রতি শীষে ১ হাজার থেকে ১২শটি ধান রয়েছে। যার ওজন ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম। যা দেশের অন্য কোনো স্থানে আছে বলে কারও কাছে শুনিনি। তিনি সরকারিভাবে ফাতেমার নামেই এই ধানের নামকরণের দাবি জানান।

মোংলা উপজেলার দত্তরমেঠ গ্রামের কৃষাণী রিনা বেগম জানান, সবার আগ্রহ এখন ফাতেমা ধানের দিকে। এই ধান বীজ সংগ্রহ করতে প্রতিদিনই অনেক লোক আসছে শুনে আমিও এসেছি। তিনিও প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে ৪ কেজি বীজ কিনেছেন। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই ধানের গাছ, ফলন, পাতা, শীষ সবকিছু অন্য যে কোনো জাতের ধান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতি গোছে একটি চারা রোপণ করা হয়। যা বেড়ে ৮-১২টি হয়েছে। প্রতিটি ধান গাছ ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার লম্বা। একেকটি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৩৬-৪০ সেন্টিমিটার। প্রতি ছড়ায় দানার সংখ্যা ১ হাজার থেকে ১২শটি। যার ওজন ৩০-৩৫ গ্রাম। ধানগাছের পাতা লম্বা ৮৮ সেন্টিমিটার, ফ্লাগলিপ (ছড়ার সঙ্গের পাতা) ৪৪ সেন্টিমিটার। ধানগাছের পাতা চওড়া দেড় ইঞ্চি। এই জাতের গাছের কাণ্ড ও পাতা দেখতে অনেকটা আখ গাছের মতো এবং অনেক বেশি শক্ত। একরপ্রতি ফলন প্রায় ১৩০ মণ। অপরদিকে আফতাব-৫ জাতের হাইব্রিড ধান প্রতি ছড়ায় ১৮০ থেকে ২৫০টি দানা হয়। এই ধানের বীজ প্রতিবারই বাজার থেকে কিনতে হয়। হেক্টরপ্রতি এই ধান উৎপাদন হয় ৫ টন। একই জমিতে কৃষক ফাতেমার উদ্ভাবিত জাতের ধানের উৎপাদন ১১ টন।

ফকিরহাট উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সোলায়মান আলী বলেন, যখন ব্যতিক্রম এ ধানগুলো ফাতেমার বাড়িতে ও মাঠে গিয়ে দেখতে পাই তখন আমার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করি। আমরা এ বছর এই ফাতেমা ধান সংগ্রহ করে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাঠিয়েছি। ফাতেমা ধান নিয়ে এখন গবেষণা চলছে। আমি মনে করি এ ধানই হবে বাংলাদেশের অধিক উৎপাদনশীল জাতের অন্যতম ধান। যা দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে। ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোতাহার হোসেন বলেন, ‘উপসহকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে এ ধানের সম্পর্কে জানতে পেরে এ বছর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে ফাতেমা ধান নিয়ে গবেষণা চলছে। ধানগুলো দেখতে আকারে সাধারণ ধানের চেয়ে কিছুটা বড়। ধানের একটি পাতা প্রায় দেড় ইঞ্চি চওড়া। ধানের গাছগুলো ১৩৫ সে.মি. লম্বা। প্রতিটি ছড়ায় গড়ে ৯৪০টি ধানের দানা উৎপাদন হয়েছে। যা সাধারণ ধানের ছড়ার থেকে ৫ গুণ বেশি। আমরা এ বছর নমুনা সংগ্রহের জন্য ধান কেটেছিলাম। সে অনুযায়ী একরে ১৩০ মণ ফলন হয়েছে। অধিক উৎপাদনশীল জাতের এই ধান আমাদের দেশের ধান উৎপাদনের চিত্রটাই পাল্টে দেবে। তবে এই জাতের ধানটি প্রাথমিক পর্যায়ে লবণসহিষ্ণু হিসেবে আমরা বিবেচনা করছি। কারণ ওই এলাকার মাটি লবণাক্ত এবং চিংড়ি ঘেরের (খামারের) মধ্যে ধানটি চাষ করা হয়েছে।

যেহেতু ধানটি ফাতেমা সংগ্রহ (অবিষ্কার) করেছেন এবং তার পরিবার চাষ করেছে, সে কারণে কৃষি বিভাগ এ ধানকে ফাতেমা ধান নাম দিতে চাচ্ছে। বর্তমানে এ ধানের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলেট ও রাজশাহী থেকে আমাদের কাছে এই ধানবীজ হিসেবে সংগ্রহ করার জন্য অনেক কৃষক আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাগেরহাট জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানান, কৃষক পর্যায়ে উদ্ভাবিত ফাতেমা ধান একটি নতুন জাতের ধান। এই ধান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কৃষক পর্যায়ে যে এত উন্নত ধরনের ধান উদ্ভাবন হয়েছে তা স্থানীয়দের মাঝে চমক সৃষ্টি হয়েছে। এই বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে ছাড় করানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow