বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ টা

অসহায় নির্বাচন কমিশন

আচরণবিধি মানতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ দলগুলোকে চিঠি

গোলাম রাব্বানী

অসহায় নির্বাচন কমিশন

আসন্ন পৌর নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী আইনকানুন মানাতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে প্রচার-প্রচারণা ও নির্বাচনী শোডাউন। মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধির তোয়াক্কা করছেন না। ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা ইসির নির্দেশনা অমান্য করেই নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। অনেক এমপির বিরুদ্ধে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আসছে ইসিতে। দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ বেশি থাকায় অনেকটাই অসহায় এখন নির্বাচন কমিশন-ইসি। তবে আচরণবিধি মানতে আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ দলগুলোকে চিঠি দিয়েছে তারা।

ইসির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারণ দর্শানো বা শোকজ করা হলেও তারা শুধু জবাব পেয়েই ক্ষান্ত থাকছেন। সতর্ক করা ছাড়া কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যদিও কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বিধিমালা লঙ্ঘন করলে তাকে ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল বা সংস্থা বিধি লঙ্ঘন করলে অনধিক ৫০ হাজার টাকা দণ্ডেরও বিধান আছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। গতকাল অনেক পৌরসভায় শোডাউন হলেও ইসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি এমপিরাও আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী অফিস পর্যন্ত উদ্বোধন করছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুই ধরনের আইন চালু থাকায় (দলীয়-নির্দলীয়) ইসি ভালোভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারছে না বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, মিশ্রভাবে পৌর নির্বাচন হওয়ায় ইসি ভালো কাজ করতে পারছে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতার কারণেও ইসি অসহায় হয়ে পড়েছে।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান ইসি কয়েকটি কারণে অসহায়। দলীয়ভাবে পৌরসভা নির্বাচনের আইনের দুর্বলতা। ইসির নিজস্ব কর্মকর্তার চেয়ে প্রশাসনের লোকদের ওপর নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব বেশি দেওয়া। মাঠ কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীনদের প্রভাবমুক্ত হতে পারছেন না। এমপিরা ইসির নির্দেশনা মানছেন না। ক্ষমতা থাকলেও প্রয়োগের সাহস দেখাচ্ছে না ইসি। রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না পুলিশ প্রশাসন। এ ছাড়া একই নির্বাচনের দুই ধরনের বিধি- তথা মেয়র পদের নির্বাচন দলীয়, কাউন্সিলর পদে নির্দলীয়। আগে থেকে দলীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা না করেই বিধিবিধান তৈরি করায় এখন এই বিধিবিধান প্রয়োগে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এমপিরা ইসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। ইসির হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে, তারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেই সব ঠিক হবে। যেসব এলাকায় এমপিরা ইসির নির্দেশনা মানছেন না ওই এলাকার নির্বাচন প্রয়োজনে বন্ধও করা যেতে পারে। তবে বর্তমান কমিশনের হাবভাবে মনে হচ্ছে, তারা নির্বাচন নিয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, এমপিদের সামলানোর বিষয়টি প্রথমে ঠিক করা উচিত ছিল। এ ছাড়া নির্বাচনী বিধিবিধান নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করলেও অনেকটা ভালো হতো বলে মনে করছেন এই সাবেক নির্বাচন কমিশনার। 

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিপপের চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইসির হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে। কিন্তু তারা রাজনৈতিক দলের যথাযথ সহযোগিতা পাচ্ছে না। দলগুলোর সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। একই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুই ধরনের বিধান থাকায় কিছুটা সমস্যাও হচ্ছে। উপরন্তু ইসিকে কার্যকরভাবে ভ‚মিকা পালন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা দরকার।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সরকারের প্রধানতম দুই অংশ- প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যদি নিরপেক্ষতা প্রদর্শন না করে তাহলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলেও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে না। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সমাজের সব স্তরের প্রতিনিধিদের কর্তব্য আছে। কিন্তু সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরপেক্ষ না হয় তাহলে কোনো লাভই হবে না। সরকারের এই দুই অংশ যদি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে তাহলে নির্বাচন কমিশন চাইলেও তা ঠেকাতে পারবে না। কমিশন যত আন্তরিকই হোক নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। তাই সরকারের আন্তরিকতা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের এই আন্তরিকতা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভ‚মিকার মাধ্যমেই প্রকাশ হবে। পৌরসভা নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা। বিশেষ করে বিএনপিসহ অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশি উৎকণ্ঠায় রয়েছে। একইভাবে ভোটাররাও আতঙ্কে রয়েছেন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে নানা ভয়ভীতি কাজ করছে তাদের মধ্যেও। এবার দলীয়ভাবে পৌরসভা নির্বাচন হওয়ায় নির্দলীয় প্রার্থীরা বেশি আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দলীয় প্রার্থীদের ক্যাডার বাহিনী ইতিমধ্যে অনেক প্রার্থীকে হুমকি-ধমকিও দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ ২০ দলকে চিঠি ইসির : পৌর নির্বাচনের দলীয় প্রধানদের পথসভা যাতে জনসভায় পরিণত না হয়, সেই বিষয়ে শতর্ক থাকতে গতকাল আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ ২০টি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিব বরাবর একটি চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর আগে মন্ত্রী-এমপিদের আচরণবিধি মানতে সংসদ সচিবালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেও চিঠি দেয় কমিশন। চিঠিতে বলা হয়েছে-পথসভা যেন জনসভায় পরিণত না হয় এবং নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে দলগুলোকে।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর